সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
সাইবার অপরাধ দমনে কঠোর হচ্ছে আইন | অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সংশোধনের উদ্যোগ সরকারের
বিশেষ প্রতিনিধি: দেশের ডিজিটাল প্রযুক্তি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধের মাত্রাও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য, গুজব, ব্ল্যাকমেইল, সাইবার বুলিং ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধগুলো ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নাগরিকদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ সংশোধনের এক বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার।
ইতিমধ্যে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট সংশোধনের একটি খসড়া বিল মন্ত্রিসভায় পেশ করা হয়েছিল। তবে মন্ত্রিসভার নির্দেশনা অনুযায়ী, সাইবার জগৎ সংশ্লিষ্ট আইটি বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করে খসড়াটি চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জনগণের মতামত গ্রহণের লক্ষ্যে বিলটি ওয়েবসাইটে প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, সাধারণ শিক্ষার্থী, নাগরিক সমাজ ও অংশীজনরা তাদের পরামর্শ ও অভিমত জমা দিয়েছেন, যা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সংকলন করেছে।
আইন প্রণয়নের এ প্রক্রিয়ায় সাধারণ জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়াকে একটি ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, অংশীজনদের মতামত নিয়েই এই সংশোধনীর রূপরেখা তৈরি করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও আশ্বস্ত করেছেন, এই আইনকে কোনো অবস্থাতেই নিপীড়নের হাতিয়ার হতে দেওয়া হবে না এবং সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা হবে।
প্রস্তাবিত খসড়া আইনে বলা হয়েছে, কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সাইবার মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য যদি দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, জনশৃঙ্খলা কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, জাতিগত সহিংসতা বা কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মানহানিকর প্রচারণার বিরুদ্ধেও তথ্য ব্লক বা অপসারণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
আইনটিতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের 'সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল' গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এ কাউন্সিলে পাঁচজন মন্ত্রী এবং সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সরকার মনোনীত দুজন বেসরকারি বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে থাকবেন।
পরিবর্তিত সাইবার অপরাধের ধরন বিবেচনা করে খসড়ায় নতুন নতুন অপরাধ ও সাজার বিধান আনা হয়েছে। বিশেষ করে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তৈরি কোনো বিকৃত কনটেন্ট দিয়ে কাউকে হেয় বা ব্ল্যাকমেইল করা হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া যৌন হয়রানি, রিভেঞ্জ পর্ন, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি ও সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর বিরুদ্ধে আইনে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়ায় যুক্ত নতুন ২৬/ক ধারা অনুযায়ী, সাইবার স্পেসে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব বা অপতথ্য ছড়ালে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া হতে পারে। এখানে গুজব বলতে এমন অসমর্থিত তথ্যকে বোঝানো হয়েছে যা জনমনে তীব্র আতঙ্ক, বিভ্রান্তি বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
একইভাবে, সংশোধিত আইনের ২৫ নম্বর ধারায় মানহানি ও হেয় প্রতিপন্ন করার অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী যদি কোনো নারী কিংবা ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু হন, তবে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
যদিও চলতি বছরের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ পাস করা হয়েছিল, তবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে অপরাধের ধরন বদলানোয় এটি আরও যুগোপযোগী করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত সুনির্দিষ্ট অপরাধী চক্রের অনলাইন চাঁদাবাজি, যেখানে নামকরা ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের নিশানা করে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হচ্ছে, তা দমনে এই সংশোধন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
তবে সাইবার অপরাধ দমনের পাশাপাশি যাতে সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করাও সরকারের একটি বড় দায়িত্ব। জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকার সনদের আলোকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য বজায় রেখেই এই আইন চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। সরকারের এই কার্যকর ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ দেশের সাইবার নিরাপত্তায় একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।