সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
বৈদেশিক ঋণের বিকল্প উৎস অনুসন্ধানে বাংলাদেশ | নজর সার্বভৌম বন্ড ও আন্তর্জাতিক বাজারে
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে সাড়ে চার শত কোটি (৪৫০ কোটি) ডলারের ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলার পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় বিকল্প পথ খুঁজছে বাংলাদেশ সরকার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি ও অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়াতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বন্ড চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এতে সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ কোটি ডলার সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বন্ড ছাড়ার জন্য কেবল মার্কিন ডলার বা ইউরোই নয়, চীনা মুদ্রা ইউয়ানে ‘পান্ডা বন্ড’ এবং জাপানি ইয়েনে ‘সামুরাই বন্ড’ ইস্যু করার বিষয়টিকেও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে লন্ডন, নিউইয়র্ক ও হংকংয়ের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে ‘রোড শো’ আয়োজনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে ঋণের চড়া সুদ, মেয়াদ, মোট খরচ ও মুদ্রার বিনিময় হারের সমীকরণ বিশ্লেষণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে যাবে সরকার।
জাপানের স্থানীয় অর্থনীতিতে বিদেশি কোনো সংস্থা বা সরকার কর্তৃক ইয়েন মুদ্রায় জারি করা বন্ডকে ‘সামুরাই বন্ড’ বলা হয়। একইভাবে চীনে ইউয়ানে ইস্যু করা বন্ড হলো ‘পান্ডা বন্ড’। আর বৈশ্বিক বাজারে ডলারে ঋণ নেওয়ার অন্যতম সুপরিচিত মাধ্যম হলো ইউরো বন্ড। বন্ড ছাড়ার আইনি ও আর্থিক পরিকাঠামো তৈরি, ট্রাস্টি নিয়োগ ও রেটিং এজেন্সির সঙ্গে পরামর্শের জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক জেপি মরগান এবং হংকংয়ের ব্রিজওয়ার্কস ইন্টারন্যাশনালকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রক্রিয়াটিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলে ধরতে আগামী ১৫ ও ১৬ নভেম্বর কক্সবাজারে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহযোগিতায় একটি আন্তর্জাতিক ঋণ ব্যবস্থাপনা সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে সরকার। এতে প্রায় ৩০টি দেশের প্রায় ১০০ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করবেন। সম্মেলনে উদ্বোধনী প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আরও অংশ নেবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিংফেং ঝাং এবং বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেম।
চলতি বছরের জুলাই মাসে অর্থ বিভাগ থেকে আট সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়, যা ঋণের সুদের হার, মেয়াদ ও ঝুঁকি পর্যালোচনা করে রূপরেখা দেবে। ডলারে ঋণ নিলে তা প্রবাসী ও রপ্তানি আয় দিয়ে মেটানো তুলনামূলক সহজ হলেও সুদের হার বেশি হলে চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, চীনা বা জাপানি মুদ্রায় সুদের হার কম হলেও ভবিষ্যতে বিনিময় হার ডলারে পরিবর্তন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এর আগে গত জুনে চীনের সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আলোচনার সময় ইউয়ানে পান্ডা বন্ড ইস্যুর বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রা ও বন্ড ছাড়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে খুব বেশি নয়। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা (আইএফসি) প্রাণ গ্রুপের অর্থায়নের জন্য লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে ৮০ কোটি টাকার ‘বাংলা বন্ড’ ছেড়েছিল। এটিকে বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রাণ-গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী জানান, বন্ডটির সুফল তারা পেয়েছিলেন এবং বাজার উন্মুক্ত হওয়া ইতিবাচক।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে সতর্ক করে জানান, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বন্ডের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের উদ্যোগ নেতিবাচক নয়, তবে ঋণের অর্থ কীভাবে এবং কোন প্রকল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। যদি বাণিজ্যিক বা লাভজনক নয় এমন দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে স্বল্পমেয়াদে উচ্চ সুদে বন্ডের টাকা খরচ করা হয়, তবে অর্থনীতির ওপর ঝুঁকি বা জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।