সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
অনলাইন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব | রাজধানীর বিপণিবিতানগুলোয় ক্রেতাশূন্যতা
একসময় রাজধানীর প্রাণবন্ত শপিংমলগুলো ছিল কেনাকাটার কেন্দ্রবিন্দু। উৎসব-পার্বণ থেকে শুরু করে সাধারণ দিনেও ক্রেতাদের ভিড়ে জমজমাট থাকত এসব বিপণিবিতান। দোকানগুলোতে চলত দিনভর বেচাকেনার ব্যস্ততা। কিন্তু সময়ের আবর্তনে সেই চিরচেনা চিত্র এখন অনেকটাই ম্লান। বর্তমানে অনেক বিপণিবিতানেই ক্রেতার উপস্থিতি নগণ্য, যার ফলে অলস সময় পার করছেন ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘক্ষণ দোকান খোলা রাখলেও প্রত্যাশিত বিক্রি মিলছে না; এমনকি কিছু দোকানে দুপুর গড়িয়ে গেলেও দিনের প্রথম বিক্রি শুরু হয় না।
রাজধানীর পরিচিত বিপণিবিতান যেমন রাপা প্লাজা, ইস্ট প্লাজা, প্লাজা এয়ার এবং অর্কিড পয়েন্টসহ বেশ কয়েকটি শপিংমল বর্তমানে ক্রেতাসংকট ও বাণিজ্যিক মন্দার শিকার। দীর্ঘদিনের লোকসান, ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয় এবং ক্রেতাদের কেনাকাটার অভ্যাসে আমূল পরিবর্তন এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ক্রমশ সংকুচিত করে তুলছে। এর ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে শান্তিনগরের ঐতিহ্যবাহী কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির সাম্প্রতিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে।
এই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে ছোট-বড় সব ধরনের ব্যবসায়ী দিশেহারা। একদিকে তাদের পুঁজি আটকে যাচ্ছে, অন্যদিকে দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অনেকের কাছে নিজেদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই এখন এক কঠিন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর প্রচলিত শপিংমলগুলোর এই সংকটের পেছনে কোনো একটি একক কারণ দায়ী নয়। বরং প্রযুক্তিগত বিপ্লব, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বাজার কাঠামোর পরিবর্তন এবং ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয়—সবকিছু মিলিয়েই বর্তমান অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
শপিংমলগুলোয় ক্রেতা কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনলাইন কেনাকাটার ব্যাপক প্রসার। এখন ঘরে বসেই ফেসবুক পেজ, বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস থেকে পছন্দের পণ্য অর্ডার করা যাচ্ছে, যা সরাসরি ক্রেতার ঠিকানায় পৌঁছে যায়। ফলে দোকানে গিয়ে সশরীরে কেনাকাটার প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশেই কমে এসেছে। বিশেষ করে তরুণ ক্রেতাদের একটি বড় অংশ অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায়ীদের অনেকেরই বড় শোরুমের উচ্চ ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল কিংবা বিপুল সংখ্যক কর্মচারীর বেতন দিতে হয় না, ফলে তারা তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়ে পণ্য বিক্রির সুযোগ পান। এই অসম প্রতিযোগিতায় ঐতিহ্যবাহী শপিংমলগুলোর ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়ছেন।
শপিংমলের ব্যবসায়িক মন্দার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ ফুটপাতকেন্দ্রিক বাজার। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের ফুটপাত এবং অস্থায়ী বাজারগুলোতে তুলনামূলক কম দামে পোশাক, জুতা, ব্যাগ ও প্রসাধনসামগ্রী পাওয়া যায়। শপিংমলের তুলনায় সাশ্রয়ী মূল্যে একই ধরনের পণ্য কেনার সুযোগ থাকায় সীমিত ও মধ্যম আয়ের অনেক ক্রেতাই ফুটপাতের দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্য ও ফ্যাশন অনুষঙ্গ কেনার ক্ষেত্রে এসব বাজারের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণ বাড়ছে, যা বিপণিবিতানগুলোর নিয়মিত ক্রেতার সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে।
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব খুচরা ব্যবসাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল এবং যাতায়াত ব্যয় মেটাতেই সাধারণ মানুষের আয়ের সিংহভাগ খরচ হয়ে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, পোশাক, প্রসাধনসামগ্রী কিংবা শখের পণ্য কেনার মতো অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলো এখন প্রয়োজন ব্যতীত কেনাকাটায় আগের মতো অর্থ ব্যয় করতে পারছে না, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে শপিংমলগুলোর বিক্রিতে।
বেচাকেনা কমে গেলেও দোকান পরিচালনার ব্যয় কিন্তু কমেনি। অভিজাত বিপণিবিতানগুলোতে দোকানভাড়া, সার্ভিস চার্জ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জেনারেটর, বিদ্যুৎ বিল এবং কর্মচারীদের বেতন নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়। বিক্রি কমে যাওয়ায় এই বিপুল ব্যয়ভার বহন করা ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীকে লোকসান সামাল দিতে ঋণের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। আয় কমে যাওয়ার বিপরীতে নির্ধারিত ব্যয় বহাল থাকায় ধীরে ধীরে তাদের সঞ্চিত পুঁজি শেষ হয়ে যাচ্ছে। এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া অনেকের কাছে আর কোনো বিকল্প থাকবে না।
১৯৯৮ সালে রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে যাত্রা শুরু করা কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি একসময় ছিল একটি পরিচিত ও জমজমাট বিপণিবিতান। কিন্তু দীর্ঘদিনের ক্রেতাসংকট, ধারাবাহিক লোকসান এবং বকেয়া বিলের চাপ সামলাতে না পেরে গত ১ অক্টোবর থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একসময়ের প্রাণচঞ্চল এই বিপণিবিতানের বন্ধ হয়ে যাওয়া রাজধানীর অন্যান্য শপিংমলের ব্যবসায়ীদের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি শুধু একটি দোকানের বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়, বরং প্রচলিত খুচরা বাণিজ্যব্যবস্থার সংকটের একটি বড় সতর্কসংকেত।
দীর্ঘদিনের লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ীর সঞ্চিত পুঁজি ফুরিয়ে গেছে। ব্যবসা চালু রাখতে ব্যাংক, আত্মীয়স্বজন বা ব্যক্তিগতভাবে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে। কোনো কোনো দোকানে বিপুল পরিমাণ পণ্য মজুত থাকলেও সেগুলো বিক্রি করে নগদ অর্থের সংস্থান করা যাচ্ছে না, ফলে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়ছে। ব্যবসার আয় কমে যাওয়ায় পরিবার চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। ছোট ও মাঝারি অনেক ব্যবসায়ীর পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস তাদের দোকান। বেচাকেনা কমে যাওয়ায় বাসাভাড়া, সন্তানদের শিক্ষার ব্যয়, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
শপিংমলকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক মন্দার প্রভাব পড়েছে কর্মচারীদের ওপরও। বিক্রি কমে যাওয়ায় অনেক দোকানমালিক কর্মচারীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ায় বিক্রয়কর্মী ও অন্যান্য কর্মচারীরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। এতে শুধু ব্যবসায়ী নয়, খুচরা বাণিজ্য খাতের সঙ্গে যুক্ত বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী শপিংমলগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ী, মার্কেট কর্তৃপক্ষ, ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়োপযোগী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রথমত, বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় দোকানভাড়া ও সার্ভিস চার্জ পুনর্নির্ধারণ করা জরুরি। মার্কেট কর্তৃপক্ষ ও দোকান মালিক সমিতি আলোচনার মাধ্যমে ভাড়া, এসি, জেনারেটর এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে, যা ব্যবসায়ীদের ওপর আর্থিক চাপ কিছুটা কমাবে।
দ্বিতীয়ত, প্রচলিত ব্যবসার পাশাপাশি অনলাইন বিক্রির ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শপিংমলের দোকানগুলোর জন্য একটি যৌথ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট কিংবা মোবাইল অ্যাপ চালু করা যেতে পারে। এতে দোকানে না এসেও ক্রেতারা পণ্য দেখতে ও অর্ডার করতে পারবেন, এবং অনলাইন ও সরাসরি বিক্রির সমন্বয়ে নতুন ক্রেতা তৈরির সুযোগ বাড়বে। তৃতীয়ত, শপিংমলগুলোকে শুধু কেনাকাটার জায়গা হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে বিনোদন ও পারিবারিক সময় কাটানোর উপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। ফুডকোর্ট, শিশুদের বিনোদনকেন্দ্র, ফ্যামিলি এন্টারটেইনমেন্ট জোন এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের ব্যবস্থা করা হলে মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে। বিভিন্ন উৎসব ও বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করে আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে।
চতুর্থত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক প্রণোদনা চালু করা প্রয়োজন। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করলে ব্যবসায়ীরা চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পরিশোধে বিশেষ সুবিধাও বিবেচনা করা যেতে পারে। পঞ্চমত, ক্রেতাদের ফিরিয়ে আনতে কার্যকর বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন উৎসব, মৌসুমি বিক্রি ও বিশেষ দিবস উপলক্ষে সম্মিলিত ছাড়, বিশেষ মূল্যছাড়, ক্যাম্পেইন ও পুরস্কারভিত্তিক প্রচারণা চালানো যেতে পারে। এতে শপিংমলগুলোতে ক্রেতাদের আগ্রহ ও উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, রাজধানীর শপিংমলগুলোর বর্তমান সংকট কেবল বেচাকেনা কমে যাওয়ার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী, কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের জীবন-জীবিকা। অনলাইন বাণিজ্যের বিস্তার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ক্রেতাদের পরিবর্তিত অভ্যাসের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে প্রচলিত বিপণিবিতানগুলোর অস্তিত্ব আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, ডিজিটাল ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং ক্রেতাদের জন্য নতুন আকর্ষণ তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা। সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় রাজধানীর পরিচিত ও জমজমাট অনেক শপিংমলই হয়তো বাণিজ্যিক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
একই ছাদের নিচে মিলবে জাপানি গাড়ির বিপুল সমাহার
৬ ঘন্টা আগে
পূর্বাচলে চার অবৈধ আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে বিএলডিএর কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান
১ দিন আগেচলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ইসলামী ব্যাংকের ৩,৩০৩ কোটি টাকা নিট লোকসান
৩ দিন আগে