সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
ঝিনাইদহে মাঠের পাঠশালায় কৃষকদের আধুনিক কৃষি জ্ঞান অর্জন
ঝিনাইদহ জেলায় এক অভিনব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাড়া ফেলেছে, যেখানে নেই কোনো প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ; বিস্তীর্ণ মাঠই এখানকার শিক্ষালয়। ‘পার্টনার ফিল্ড স্কুল’ নামের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের প্রধান শিক্ষার্থী হলেন স্থানীয় কৃষাণ-কৃষাণীরা। তাদের হাতে শোভা পাচ্ছে বই-খাতা, চোখেমুখে নতুন জ্ঞান অর্জনের প্রবল আগ্রহ। তারা শিখছেন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পুষ্টিবাগান তৈরি, এবং স্বল্প ব্যয়ে অধিক ফলনের আধুনিক কৌশল।
এই ‘পার্টনার ফিল্ড স্কুল’ প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বয়স কোনো বাধা নয়, বরং অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে কৃষিকে আরও উন্নত, পুষ্টিসমৃদ্ধ এবং পরিবেশবান্ধব করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্যোগে সদর উপজেলার পাগলাকানাই ইউনিয়নের বানিয়াকান্দর গ্রামে এই বিশেষ পাঠশালার আয়োজন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা, পাগলাকানায় ইউনিয়নের বানিয়াকান্দর ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহানারা খাতুন, কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা এবং বিভিন্ন বয়সী প্রান্তিক কৃষাণ-কৃষাণীরা। পাঠদানের পাশাপাশি এখানে চলে প্রশ্নোত্তর পর্ব, আলোচনা এবং হাতে-কলমে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষকদের প্রশ্নের উত্তরে কৃষকরা নিজেদের দীর্ঘদিনের চাষাবাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন, যেখানে ভুল শুধরানো হয় এবং সঠিক উত্তরদাতাদের শেখার আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
এই পাঠশালায় কেবল ফসলের উৎপাদন কৌশলই শেখানো হয় না। এখানে পুষ্টি উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ এবং কৃষিকে কেন্দ্র করে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয়। এর ফলে অংশগ্রহণকারীরা শুধু নিজেদের কৃষিকাজেই উন্নতি করছেন না, বরং পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং বাড়তি আয়ের নতুন সুযোগও খুঁজে পাচ্ছেন।
এই প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে অনেক কৃষাণীই নিজেদের বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেছেন ছোট-বড় সবজি বাগান। এর মাধ্যমে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে বিক্রির জন্য অতিরিক্ত সবজিও উৎপাদন হচ্ছে। অন্যদিকে, অনেক কৃষক আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণ করে সীমিত খরচে অধিক ফলন পেতে সক্ষম হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ কমছে, তেমনই বাড়ছে তাদের লাভের সম্ভাবনা। সামগ্রিকভাবে, কৃষিক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে নতুন চিন্তা-চেতনা, যা চাষাবাদের প্রচলিত ধারণাকে পাল্টে দিচ্ছে।
অংশগ্রহণকারী কৃষাণী বিথী খাতুন তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “আগে আমরা নিজেদের প্রথাগত জ্ঞান অনুযায়ী চাষাবাদ করতাম। এখন এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সার, বীজ এবং ফসলের পরিচর্যা সম্পর্কে নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি জানতে পেরেছি। সঠিক নিয়মে চাষাবাদ করায় কম খরচে ভালো ফলন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।” কৃষক রিপন হোসেন মন্তব্য করেন, “এই স্কুল থেকে পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি চাষের বিষয়ে অনেক কিছু শিখেছি। সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এখন বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করছি, যা অল্প খরচে অধিক ফলন দিতে সাহায্য করছে।” কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী নিশিতা বিশ্বাস জানান, “পার্টনার ফিল্ড স্কুল থেকে ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ, রোগবালাই দমন এবং মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষার কৌশল শিখেছি। এর ফলে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর পাশাপাশি নিরাপদ ফসল উৎপাদনেও আমরা উৎসাহিত হচ্ছি।”
ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা এই উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, “প্রান্তিক কৃষাণ-কৃষাণীদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, পুষ্টি উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ সম্পর্কে হাতে-কলমে ব্যবহারিক জ্ঞান দিতেই পার্টনার ফিল্ড স্কুলের আয়োজন করা হচ্ছে। কৃষকরা যেন তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে স্বল্প খরচে অধিক উৎপাদন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও, কৃষির মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং পারিবারিক পুষ্টি নিশ্চিত করার বিষয়েও আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি।”
কৃষিক্ষেত্রে উন্নতি ঘটাতে শুধু উর্বর মাটি, উন্নত বীজ কিংবা পর্যাপ্ত সেচই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান ও দক্ষতা। এই ভাবনা থেকেই মাঠের এই বিশেষ পাঠশালায় কৃষাণ-কৃষাণীদের জন্য নতুন করে শেখার এক অসাধারণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক জ্ঞানের এই মেলবন্ধন শুধু চাষাবাদের ধরনই বদলে দিচ্ছে না, বরং কৃষকদের জীবনে পুষ্টি ও সমৃদ্ধির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।