সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
সাতকানিয়ায় ৭ দিন চুলায় আগুন জ্বলেনি, পানিবন্দি হাজারো পরিবারে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার কারণে হাজারো মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি। বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর কমতে শুরু করলেও অসংখ্য পরিবার এখনো জলবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। বসতঘরে পানি ঢুকে যাওয়ায় রান্না-বান্না বন্ধ হয়ে গেছে এবং এর ফলে তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
উপজেলার বন্যাকবলিত সাতকানিয়া পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খলিফাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আম্বিয়া খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তাদের ঘর এখনো কোমর সমান পানির নিচে ডুবে আছে। তিনি বলেন, “ঘরে ঢুকলেই শুধু পানি আর কাদা। টানা সাত দিন ধরে চুলায় আগুন জ্বালাতে পারিনি। ভাত রান্নার কোনো উপায় নেই। যেটুকু শুকনো খাবার ছিল, তাও কয়েক দিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। এখন একবেলা খেলে আরেক বেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। ছোট ছোট সন্তানদের ক্ষুধার কান্না শুনেও কিছু করতে পারছি না। বিশুদ্ধ পানিরও খুব কষ্ট। ঘরের আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, চাল-ডাল—সব নষ্ট হয়ে গেছে। ধার-দেনা করে কোনোভাবে দিন পার করছি।”
আম্বিয়া খাতুন আরও যোগ করেন, “আমাদের মতো অসংখ্য পরিবার এখন চরম দুর্ভোগে রয়েছে। আমরা চাই, দ্রুত আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হোক। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি এগিয়ে না আসেন, তাহলে পরিবার নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকব জানি না। আমার বাড়িটি পড়ে গেছে, হয়তো বন্যার পানি নেমে গেলে ভেঙে যাবে। আমাদের দিকে একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিন।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, অসংখ্য পরিবারের ঘরবাড়ি, রান্নাঘর ও নলকূপ এখনো পানিতে ডুবে রয়েছে। বন্যার কারণে খাদ্যসামগ্রী, আসবাবপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু কিছু দুর্গম এলাকায় নৌকাই এখন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। এসব দুর্গম অঞ্চলে ত্রাণ পৌঁছাতেও বেগ পেতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক পরিবার একবেলা খেয়ে দিন পার করছে। শিশু, বৃদ্ধ, নারী ও অসুস্থ ব্যক্তিরা এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
স্থানীয় সমাজসেবক জিহান মাহমুদ বলেন, আম্বিয়া বেগমের মতো অসংখ্য পরিবার এখনো চরম মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ঘরে পানি থাকায় তারা রান্না করতে পারছেন না, অনেকের ঘরে কোনো খাবারও নেই। ছোট ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে তারা খুব কষ্টে আছেন। তিনি জানান, তারা ব্যক্তিগতভাবে কিছু সহায়তা করার চেষ্টা করছেন, তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। জিহান মাহমুদ আরও বলেন, প্রশাসন, বিত্তবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন যদি আরও সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে আম্বিয়া বেগমের মতো অসহায় পরিবারগুলোর দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, উপজেলা প্রশাসন বন্যাকবলিত মানুষের পাশে রয়েছে। সরকারি বরাদ্দের চাল, শুকনো খাবার ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী ইউনিয়নভিত্তিক বিতরণ করা হচ্ছে। তিনি নিশ্চিত করেন, দুর্গম এলাকাগুলোতেও ত্রাণ পৌঁছে দিতে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। ইউএনও আরও জানান, কেউ যেন খাদ্যসহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসনের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।