সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
ঐতিহ্যবাহী শিদল তৈরির কৌশল ও এর পেছনের ইতিহাস
মাছ ও কচুর সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত বিশেষ ধরনের গাঁজানো খাবার ‘শিদল’। কোনো বাড়ীতে শিদল রান্না শুরু হলে তার তীব্র ও সুনির্দিষ্ট ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। কারও কাছে এই ঘ্রাণ ভীষণ লোভনীয়, আবার কারও জন্য কিছুটা অস্বস্তিকর। তবে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও অতুলনীয় স্বাদের কারণে আবহমান বাংলার রন্ধনশিল্পে শিদল একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। দীর্ঘদিন ধরে মাছ সংরক্ষণের লোকজ কৌশল থেকে উৎপত্তি হওয়া এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটি তৈরির প্রক্রিয়াটিও বেশ আকর্ষণীয়।
মূলত সিলেট অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার মতো উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে শিদল প্রস্তুত ও খাওয়ার প্রচলন বেশি। অঞ্চলভেদে এটি তৈরির উপকরণ ও পদ্ধতিতে সামান্য ভিন্নতা দেখা যায়। প্রাচীনকালে বর্ষা মৌসুমে যখন নদী-নালা ও হাওর-বিলে বিপুল পরিমাণ ছোট মাছ ধরা পড়ত, তখন তা সংরক্ষণের আধুনিক সুবিধা বা রেফ্রিজারেটর ছিল না। উদ্বৃত্ত মাছ নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে ও বছরের অন্যান্য সময়ে খাওয়ার উপযোগী রাখতে মানুষ প্রাকৃতিকভাবে রোদে শুকানো এবং গাঁজন বা ফারমেন্টেশন পদ্ধতি উদ্ভাবন করে। শিদল হলো সেই প্রাচীন খাদ্য সংরক্ষণের এক অপূর্ব ফসল।
শিদলের মূল উপাদান হলো গুঁড়ো করা ছোট মাছ (বিশেষ করে পুঁটি মাছ), কচু এবং প্রয়োজনীয় লবণ। তৈরির প্রাথমিক ধাপে মাছ ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে বাঁশের মাচায় বা চাটাইয়ে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং যথাযথ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে মাছের শুঁটকি গুণগত মান বজায় রাখে। অপরদিকে, কচুর খামির প্রস্তুত করা হয়, যা শুকনা মাছের গুঁড়োর সাথে আঠালো উপাদান হিসেবে কাজ করে।
পরবর্তী ধাপে চিরাচরিত নিয়মে হামানদিস্তা বা ঢেঁকিতে শুঁটকি ভালোভাবে গুঁড়ো করে নেওয়া হয়। এরপর কচুর খামির ও সঠিক মাত্রায় লবণ মিশিয়ে সব উপকরণ হাতে খুব ভালোভাবে মেখে নেওয়া হয়। উপাদানগুলোর সঠিক অনুপাত এবং আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অতিরিক্ত আর্দ্রতা থাকলে মিশ্রণে পচন ধরতে পারে।
সবশেষে প্রস্তুতকৃত খামিরটি পরিষ্কার ও শুকনো মাটির হাঁড়িতে চেপে চেপে ভর্তি করা হয়, যেন ভেতরে কোনো ফাঁকা হাওয়া না থাকে। এরপর সুনির্দিষ্ট নিয়মে হাঁড়ির মুখ কলাপাতা, পরিষ্কার কাপড়ে ঢেকে কিংবা মাটির প্রলেপ দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করে রাখা হয়। এভাবে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস মুখ বন্ধ পাত্রে রাখা হলে অণুজীবের প্রভাবে গাঁজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই ফারমেন্টেশনের ফলেই তৈরি হয় শিদলের সুনির্দিষ্ট ঘ্রাণ ও অতুলনীয় স্বাদ। পরবর্তীতে এই শিদল দিয়ে রসুন, পেঁয়াজ ও মরিচ সহযোগে তৈরি করা হয় মুখরোচক শিদল ভর্তা কিংবা বিভিন্ন সবজির ঐতিহ্যবাহী পদ।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী, লেখক, ও চিকিৎসক ডা. আবদুস সাত্তারের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন
৫ দিন আগে
অবহেলা আর ঔদাসীন্যে হারিয়ে যাচ্ছে আলমডাঙ্গার গর্বের স্থাপনাগুলি
১ সপ্তাহ আগে
ইমামের মসনদ থেকে বন্দুকের রাজত্ব—দাদা তপনের রোমহর্ষক উত্থান-পতন
২ সপ্তাহ আগে