সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা | ডিসেম্বরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা, রয়টার্সকে বিস্তারিত জানালেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য জানিয়েছেন। ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা অবশ্য সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ উল্লেখ করেননি।
শুক্রবার (১০ জুলাই) রয়টার্স প্রকাশিত প্রায় এক ঘণ্টার এই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, "ফিরে গেলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। তবু আমাকে ফিরতেই হবে।" তিনি আরও যোগ করেন, "আমার দলের নেতাকর্মীরা চরম নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যুই আসে, তবে আমি চাই সেটি আমার নিজের মাটিতেই আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা শায়িত আছেন এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।"
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা জানান, তিনি এবং দেশত্যাগ করা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হবেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ সরকার তাকে ফিরিয়ে নিতে ভারতের কাছে বারবার চিঠি পাঠাচ্ছে, তবে কাউকে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে না, তিনি নিজেই দেশে ফিরবেন। "তারা আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। এ জন্য তারা বারবার ভারতের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছে। কিন্তু আমি নিজেই দেশে যাব," বলেন শেখ হাসিনা।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাসনে যাওয়ার পর এই প্রথম শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ করলেন এবং আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছার কথা জানালেন। তিনি দাবি করেন যে তার সঙ্গে দলের আরও কয়েকজন নির্বাসিত নেতা একই পরিকল্পনা করছেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, যিনি বিভিন্ন মামলার আসামি, তার নামও এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে অন্য নেতাদের অবস্থান বা পরিকল্পনা যাচাই করতে পারেনি।
শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের মুখপাত্ররা রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি, তবে গত এপ্রিলে জানিয়েছিল যে তারা শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বাংলাদেশের অনুরোধ পর্যালোচনা করছে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছাত্র আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই দমন-পীড়নে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়ে থাকতে পারেন।
শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে বলেন, "আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। আমি তাদের বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি। একদিন তোমরাও সবাই ফিরে এসো। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।" তিনি কবে ফিরবেন, কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বা ঠিক কোন দিনে তা হবে, এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।
বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখে শেখ হাসিনা জানান, বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে মানুষ বুঝতে পারবে আদালতের কার্যক্রম কতটা প্রহসনমূলক। তার ভাষায়, "আমি ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি। বিচার শুরু হলে মানুষ নিজেরাই বুঝতে পারবে আদালত কতটা প্রহসনের। সেটিই আমি প্রমাণ করতে চাই।"
তিনি আরও বলেন, "কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতে পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দের বিচার করার অধিকার জনগণের। সেই বিচার আমি জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।" আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন বলেও তিনি জানান। পরিশেষে শেখ হাসিনা বলেন, "আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়ে থাকতে পারে, ফলে আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে? আমরা যদি খারাপ কাজ করে থাকি, সেটির বিচার জনগণই করুক।"