সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
নির্ভুল রোগ নির্ণয় ও নিরাপদ চিকিৎসা | বায়োমেডিকেল যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন কেন জরুরি?
সুস্থ জীবনযাপন এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নির্ভুল রোগ নির্ণয় ও কার্যকর চিকিৎসা অপরিহার্য। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশ নির্ভর করে বিভিন্ন বায়োমেডিকেল যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর। তাই হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত এই যন্ত্রগুলোর নির্ভুলতা রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি মৌলিক শর্ত।
বর্তমানে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ এবং অপারেশন থিয়েটারে অসংখ্য রোগীর চিকিৎসায় অত্যাধুনিক বায়োমেডিকেল যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে রোগীর শারীরিক অবস্থার পর্যবেক্ষণ, ওষুধ প্রয়োগ এবং জীবনরক্ষাকারী সহায়তা—সর্বত্রই এসব যন্ত্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু এই মূল্যবান যন্ত্রগুলো কি সবসময় সঠিক ও নির্ভরযোগ্য ফলাফল দিচ্ছে? একটি আধুনিক ও ব্যয়বহুল যন্ত্র হলেও, নির্দিষ্ট সময় পরপর ক্যালিব্রেশন না করা হলে এর পরিমাপের নির্ভুলতা হ্রাস পেতে পারে। এর ফলে ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রোগ নির্ণয় ও ভুল চিকিৎসা হওয়ার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়। দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশে চিকিৎসা যন্ত্রের নিয়মিত ক্যালিব্রেশনের বিষয়টি এখনও সেভাবে গুরুত্ব পায়নি, যা কাম্য।
ক্যালিব্রেশন কী এবং এর গুরুত্ব
ক্যালিব্রেশন হলো একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে কোনো যন্ত্রের পরিমাপকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ডের সাথে তুলনা করে তার নির্ভুলতা যাচাই করা হয়। সহজ ভাষায়, একটি যন্ত্র যে পরিমাপ দেখাচ্ছে তা প্রকৃত মানের কতটা কাছাকাছি, ক্যালিব্রেশন সেই বিষয়টি নিশ্চিত করে। সময়ের সাথে সাথে যন্ত্রের সেন্সর, ইলেকট্রনিক উপাদান এবং পরিমাপ ব্যবস্থার কার্যক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে, যা পরিমাপে ত্রুটি সৃষ্টি করে। নিয়মিত ক্যালিব্রেশনের মাধ্যমে এই ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধন করা সম্ভব হয়, ফলে যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত ফলাফল আরও নির্ভরযোগ্য, সঙ্গতিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। ক্যালিব্রেশনের মূল উদ্দেশ্য যন্ত্র মেরামত করা নয়, বরং তার পরিমাপের নির্ভুলতা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে সমন্বয় বা অ্যাডজাস্টমেন্টের প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ করা। এ কারণেই ক্যালিব্রেটেড যন্ত্রের ফলাফল বিশ্বের যেকোনো দেশের একই ধরনের যন্ত্রের ফলাফলের সাথে তুলনাযোগ্য হয়, যাকে আন্তর্জাতিক পরিমাপ বিজ্ঞানে ‘ইন্টারন্যাশনাল কম্প্যারেবিলিটি’ বলা হয়।
চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে যন্ত্রের তথ্যের প্রভাব
একজন চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং বিভিন্ন ল্যাব টেস্টের ফলাফল বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। এক্ষেত্রে যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত নির্ভুল তথ্য তার সিদ্ধান্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। কিন্তু যদি কোনো যন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ হয় বা দীর্ঘদিন ক্যালিব্রেশন না করার কারণে ভুল তথ্য দেয়, তাহলে চিকিৎসকের সিদ্ধান্তও ভুল হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। রোগীর হৃদ্যন্ত্র, শ্বাসপ্রশ্বাস, কিডনি বা রক্তের অবস্থা সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে, যার ফলস্বরূপ অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ভুল ওষুধ প্রয়োগ বা এমনকি ভুল চিকিৎসার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভেন্টিলেটর ভুল চাপ দিলে, ইনফিউশন পাম্প ভুল মাত্রায় ওষুধ সরবরাহ করলে, কিংবা পালস অক্সিমিটার ভুল অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখালে, চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে।
রোগীর নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সংযোগ
ভেন্টিলেটর, ইনফিউশন পাম্প, পালস অক্সিমিটার, সিপ্যাপ, বাইপ্যাপ, ইনকিউবেটরসহ বিভিন্ন বায়োমেডিকেল যন্ত্র সরাসরি রোগীর জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত হয়। এসব যন্ত্রে সামান্য ত্রুটিও রোগীর জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নবজাতক, প্রবীণ এবং সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেশি। ইনফ্যান্ট ইনকিউবেটরের কথাই ধরা যাক, যা নবজাতকের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে। যদি এই যন্ত্রের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা বা অক্সিজেনের মান নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি বা কম হয়, তবে নবজাতকের শ্বাসকষ্ট, অক্সিজেনজনিত জটিলতা, স্নায়বিক সমস্যা এমনকি স্থায়ী অঙ্গক্ষতির মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে।
ক্যালিব্রেশনের পাশাপাশি ইলেকট্রিক্যাল সেফটি টেস্টের প্রয়োজনীয়তা
বেশিরভাগ বায়োমেডিকেল যন্ত্র বিদ্যুৎচালিত এবং প্রায়শই সরাসরি রোগীর শরীরের সাথে সংযুক্ত থাকে। খুব অল্প মাত্রার বৈদ্যুতিক প্রবাহও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, বিশেষ করে যখন রোগী শারীরিকভাবে দুর্বল বা সংকটাপন্ন থাকেন। ক্যালিব্রেশন এবং ইলেকট্রিক্যাল সেফটি টেস্ট দুটি পৃথক তবে সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যন্ত্রের পরিমাপের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এর বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাও পরীক্ষা করা অপরিহার্য। উন্নত দেশগুলোতে নিয়মিত ইলেকট্রিক্যাল সেফটি টেস্ট হাসপাতালের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি বাধ্যতামূলক অংশ।
বাংলাদেশে গড়ে উঠছে নতুন সক্ষমতা
চিকিৎসা-যন্ত্রের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (বিআরআইসিএম) একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন এই প্রতিষ্ঠানটি হাসপাতালের আইসিইউ, সিসিইউ, এনআইসিইউ ও অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহৃত ৩২ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বায়োমেডিকেল যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন সেবা চালু করেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিআরআইসিএম এই সেবা প্রদান করছে এবং প্রতিষ্ঠানটির ক্যালিব্রেশন সেবা আন্তর্জাতিক মেট্রোলজি নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত। দেশের বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য হাসপাতাল ইতোমধ্যেই বিআরআইসিএমের এই সেবা গ্রহণ করে অধিকতর নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সক্ষমতা অর্জন করছে।
সেবাগ্রহীতার সচেতনতা জরুরি
স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন কেবল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়; রোগী ও তাদের স্বজনদের সচেতনতাও এ বিষয়ে সমান গুরুত্বপূর্ণ। রোগী বা তাদের অভিভাবকেরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবহৃত যন্ত্রের সর্বশেষ ক্যালিব্রেশন স্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইতে পারেন। যন্ত্রের গায়ে ক্যালিব্রেশন স্টিকার বা সনদ যাচাই করাও সচেতনতার একটি অংশ হতে পারে।
শেষ কথা
আধুনিক স্বাস্থ্যসেবায় উন্নত যন্ত্রপাতি থাকাই যথেষ্ট নয়; সেগুলো নির্ভুলভাবে কাজ করছে কি না, সেটিই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ক্যালিব্রেশন ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা বাড়বে, অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা কমবে এবং রোগীর নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় হবে। তাই বায়োমেডিকেল যন্ত্রের নিয়মিত ক্যালিব্রেশন ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা পরীক্ষাকে হাসপাতালের মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার এখনই উপযুক্ত সময়।
লেখক: ড. মালা খান, চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার ও প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞানী, বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (বিআরআইসিএম)।