সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
খুলনায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ | হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া ভিড়, শয্যা সংকটে রোগীরা
খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে, যার ফলস্বরূপ সরকারি-বেসরকারি সকল হাসপাতালগুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র শয্যা সংকট। খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা ২৫০ থেকে দ্বিগুন বাড়িয়ে ৫০০ তে উন্নীত করা হলেও, বর্তমানে রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণেরও বেশি। বাধ্য হয়ে রোগীদের হাসপাতালের মেঝে এবং বারান্দায় চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে হচ্ছে, একই অবস্থা বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা চরম বিপাকে পড়েছেন।
২২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম, যিনি তিনদিন আগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন, জানান, খুলনার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা খুঁজেও ব্যর্থ হয়েছি। অবশেষে খুমেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি, কিন্তু এখানেও বেড খালি না থাকায় বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছি।
একইভাবে, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুজাতা বলেন, গত দুইদিন আগে আমার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। সিটি মেডিকেলসহ কয়েকটি হাসপাতালে যোগাযোগ করেও শয্যা না পেয়ে খুমেক হাসপাতালে এসেছি। এখানেও বেড না পেয়ে বারান্দায় থাকতে হচ্ছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। তবে রোগী বেশি হলেও চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি হচ্ছে না। ওষুধ এবং কিট পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত আছে। রোগীর চাপ আরও বৃদ্ধি পেলে নিচতলার জরুরি বিভাগে একটি পৃথক ইউনিট খোলার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় উন্নীত হলেও বর্তমানে প্রায় ২৮০০ থেকে ২৯০০ রোগী ভর্তি রয়েছেন। এতে শয্যা সংকটের পাশাপাশি ডাক্তারসহ অন্যান্য লোকবল সংকটও প্রকট হচ্ছে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) স্বাস্থ্য বিভাগ ডেঙ্গু আক্রান্তের জন্য চারটি ওয়ার্ড, ৩০, ২৯, ২৮ ও ২২ নম্বরকে রেড জোন বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। এসব এলাকায় মশক নিধনে বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও স্থাপনায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছে এবং মশার লার্ভা জন্মানোর মতো পরিবেশ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
কেসিসির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৩১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ ১১১ জন এবং ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে ১০০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। রেড জোনের অন্তর্ভুক্ত ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৮০ জন ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডে ৭৭ জন রোগী রয়েছেন। এছাড়া ১৭, ১৮, ২৩, ২৪ ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ (কমলা জোন) ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ২৬৮ জন। ১৫, ২০, ২৫ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডকে কম ঝুঁকিপূর্ণ (হলুদ জোন) তালিকায় রাখা হয়েছে, যেখানে ১১৭ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানান, ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বিবেচনা করে চারটি ওয়ার্ডকে রেড, পাঁচটি ওয়ার্ডকে কমলা এবং চারটি ওয়ার্ডকে হলুদ জোন ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০টি ফগার মেশিন ও হ্যান্ড স্প্রের সাহায্যে মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। এছাড়া উন্মুক্ত স্থান ও বড় নালার মশা মারতে প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি হুইল ব্যারো ফগার মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কেসিসির তৎপরতা ও মশক নিধনে বিশেষ কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্থাপনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
কেসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শরীফ শাম্মীউল ইসলাম বলেন, খুলনা জেনারেল হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর বড় বড় হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো প্রতিদিন ডেঙ্গু শনাক্তের রিপোর্ট কেসিসিতে পাঠাচ্ছে। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই আক্রান্তের তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার কেসিসির সমালোচনা করে বলেন, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ডেঙ্গুর উপদ্রব বেড়েছে। মৌসুম আসার আগেই আমরা বারবার মশক নিধনে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলাম, কিন্তু তাতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। চলমান মশক নিধন অভিযানেরও সুফল দেখা যাচ্ছে না। তিনি মশার ওষুধ অকার্যকর হওয়ার কারণ খুঁজে বের করা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা সাজানোর ওপর জোর দেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সভাপতি কুদরত ই খুদা বলেন, আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ তৎপরতা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ইতিবাচক। কিন্তু উপদ্রব বাড়ল কেন? কার গাফিলতিতে ঘরে ঘরে ডেঙ্গু বাড়ছে, সেটি খুঁজে বের করা প্রয়োজন। কেসিসির পাশাপাশি নগরবাসীকেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, তাহলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।