সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
চট্টগ্রাম বন্যায় কমছে জল, বাড়ছে দুর্ভোগ | ঘরহারা মানুষের হাহাকার
টানা অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যার পানি চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ধীরগতিতে নামতে শুরু করেছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বন্যার ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ। অসংখ্য বসতঘর ধসে পড়েছে, সড়ক যোগাযোগ ভেঙে গেছে বহু জায়গায়। তলিয়ে নষ্ট হয়েছে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি ও সবজিক্ষেত। মাছের ঘের ও বিভিন্ন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে, ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য পোলট্রি খামার। চারদিকে এখন কেবল ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন, আর এর শিকার মানুষের দীর্ঘশ্বাস ও আহাজারি।
বাঁশখালী উপজেলায় এখনও হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। বন্যা পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক না হওয়ায় অনেক এলাকায় জল জমে আছে। চরম বিপর্যস্ত এই পানিবন্দি মানুষগুলোর অধিকাংশই রান্না করতে না পারায় তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছেন। তবে উপজেলা প্রশাসন তাদের কাছে রান্না করা খাবার ও শুকনো খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঁশখালীর বাহারছড়া এলাকায় অসংখ্য ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ ধসে গেছে। উপজেলার প্রধান সড়কের বেশ কয়েকটি স্থানে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ সড়ক ভেঙে গিয়ে বা পানিতে বিলীন হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাঈফ আনোয়ার বলেন, “পানি কমলেও আমরা যারা বাড়িতে ফিরছি, তাদের অনেকেই বসবাসের উপযোগী পরিবেশ পাচ্ছি না। কারও ঘর সম্পূর্ণ ধসে গেছে, আবার কেউ সব হারিয়ে দিশেহারা হয়ে দিন কাটাচ্ছেন।” তার অভিযোগ, অনেক দুর্গত পরিবার এখনও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা পায়নি। কর্মহীন হয়ে পড়ায় দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
গন্ডামারা ইউনিয়নের বাসিন্দা শফকত হোসাইন চাটগামী জানিয়েছেন, গন্ডামারা, ছনুয়াসহ কয়েকটি ইউনিয়নে এখনও জল জমে আছে। অনেক পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে না পেরে নিজেদের ঘরেই পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাহারছড়া ইউনিয়নের সৌদি প্রবাসী আব্দুল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই বন্যায় আজ আট দিন ধরে মানুষ পানিবন্দি। যেখানে জল নামছে, সেখানেই ভেসে উঠছে ধ্বংসের চিত্র। অনেকের চুলায় বহু দিন ধরে আগুন জ্বলেনি।” তিনি অভিযোগ করেন, খালের স্লুইচ গেটগুলো মাছের ঘেরের সুবিধার জন্য বন্ধ রাখা হয়, যা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন জানান, উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এখনও জলবন্দি। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, বন্যার পানিতে চার হাজারের বেশি মাটির ও কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তালিকা তৈরির জন্য প্রশাসনের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে।
এদিকে, সাতকানিয়া উপজেলায় সোমবার থেকে বন্যার জল নামতে শুরু করায় দুর্গত মানুষ সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়িতে ফিরছেন। তবে বাড়িতে ফিরেও মিলছে না স্বস্তি। অধিকাংশ ঘর কাদা ও আবর্জনায় ভরে গেছে, আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পানিতে নষ্ট হয়েছে। অনেক মাটির ঘর ধসে পড়ায় মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত নেই। একইসাথে, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রবিবার পর্যন্ত সাতকানিয়ার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ অবস্থান করছিলেন। সোমবার জল নামতে শুরু করার পর তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। বাকিরাও জল সম্পূর্ণরূপে নেমে গেলে ফিরে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি ইউনিয়ন থেকে জল নেমে গেলেও কিছু এলাকায় এখনও জলাবদ্ধতা বিদ্যমান। রাস্তাঘাট ডুবে থাকায় মানুষের দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি। ক্ষতিগ্রস্ত মাটির ঘরের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যদি আর বৃষ্টি না হয়, তাহলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম মহানগরসহ জেলার মোট ১৬টি উপজেলা বন্যা ও জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো হলো চট্টগ্রাম মহানগর, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, সাতকানিয়া, পটিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, সন্দ্বীপ, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, বাঁশখালী ও কর্ণফুলী। এসব উপজেলার মোট ১২২টি ইউনিয়ন ও এলাকা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছে। এর মধ্যে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ধস ও বন্যায় এ পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যু ও ১২ জন আহত হয়েছেন। বর্তমানে ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ১৬ হাজার ৮২১ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, সোমবার পর্যন্ত দুর্গতদের মধ্যে ৬৮৪ টন চাল এবং ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে চাহিদা ছিল ৬২২ টন চাল ও ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। তিনি আরও জানান, প্রয়োজন অনুযায়ী আগামী কয়েকদিনও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।