সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
পবিত্র কোরআনের কিছু বিধান কেন রহিত করা হয়েছিল | নেপথ্যের প্রজ্ঞা ও তাৎপর্য
আল্লাহ তাআলা মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা। তিনি খুব ভালো করেই অনুধাবন করেন যে মানুষের জন্য কোন সময় কোন বিধান সবচেয়ে বেশি কল্যাণকর এবং কোন পরিস্থিতিতে কেমন নির্দেশনা উপযোগী। সময়ের প্রয়োজনে এক কার্যকর বিধানের স্থলে নতুন অন্য কোনো নির্দেশ অবতীর্ণ করার মধ্যে মহান প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় এই পরিবর্তনকে ‘নাসখ’ বা বিধান রহিতকরণ বলা হয়।
তবে এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই পরিবর্তন কি পূর্ববর্তী বিধানের কোনো ত্রুটি দূর করার জন্য, নাকি এর পেছনে বান্দার কল্যাণ ও আনুগত্যের অনন্য পরীক্ষা জড়িয়ে রয়েছে?
নাসখ বা রহিতকরণ কী?
‘নাসখ’ একটি আরবি শব্দ, যার আভিধানিক অর্থ কোনো কিছু অপসারণ করা, পরিবর্তন করা কিংবা এক বস্তুর স্থানে অন্য কিছু প্রতিস্থাপন করা। ইসলামি পরিভাষায় নাসখ বলতে বোঝায়—পরবর্তী ওহি বা দলিলের মাধ্যমে পূর্ববর্তী কোনো আদেশের কার্যকারিতা সমাপ্ত করা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, ‘আমি কোনো আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে তার চেয়ে উত্তম অথবা তার অনুরূপ কিছু নিয়ে আসি।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১০৬)। এ আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, বিধান রহিত করা সম্পূর্ণভাবে মহান আল্লাহর ক্ষমতা ও ঐশ্বরিক ইচ্ছার অধীন। তাঁর কোনো সিদ্ধান্তই সীমাবদ্ধতা, ভুল কিংবা অপারগতার ফসল নয়। রহিত বিধানের জায়গায় যে নতুন বিধান আসে, তা মানুষের জন্য আরও সহজ ও অধিক উপকারী হয়ে থাকে; কখনো কখনো তা আগের বিধানের অনুরূপও হতে পারে (তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/২৯৫)।
রহিতকরণের ধরন ও প্রকারভেদ
ইসলামি স্কলারদের মতে, নাসখ বা রহিতকরণের পদ্ধতি প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত—
- প্রথমত, কোরআনে আয়াতের তিলওয়াত বা পাঠ্যরূপ বহাল থাকে, কিন্তু তার বিধান রহিত হয়ে যায়। কোরআনে এর উদাহরণই সর্বাধিক।
- দ্বিতীয়ত, আয়াতের পাঠ্যরূপ রহিত হয়ে গেলেও তার বিধান ইসলামী শরিয়তে বহাল থাকে।
- তৃতীয়ত, আয়াতের তেলাওয়াত ও বিধান—উভয়ই রহিত হয়ে যায় (মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কুরআন, ২/১৬৭)।
সুতরাং কোরআনে কোনো আয়াত বহাল থাকার অর্থই তা বর্তমানে কার্যকর—এমন ধারণা যেমন সঠিক নয়, তেমনি বিধান রহিত হলে আয়াতের সম্মান ও মর্যাদা কমে যায় না। বিধানের প্রয়োগ এবং আল্লাহর বাণী হিসেবে আয়াতের সম্মান সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।
বান্দার সুবিধার প্রতি খেয়াল রাখা
মানুষের সামাজিক বাস্তবতা ও সামর্থ্য বিবেচনা করে শরিয়তের বিধান বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে। নাসখের মূল তাৎপর্য হলো, যথাসময়ে মানুষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী বিধান কার্যকর করা। যুদ্ধক্ষেত্রে ঈমানদারদের ধৈর্যের নির্দেশে এর স্পষ্ট উদাহরণ মেলে। শুরুতে সুরা আনফালের ৬৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছিল, ২০ জন ধৈর্যশীল মুমিন ২০০ জনের ওপর বিজয়ী হবে (অর্থাৎ ১ জনের বিপরীতে ১০ জন)। কিন্তু পরের আয়াতেই (সুরা আনফাল, ৬৬) বলা হয়, ‘এখন আল্লাহ তোমাদের ভার লাঘব করে দিলেন...’ এবং এই অনুপাত ১ জনের বিপরীতে ২ জনে কমিয়ে আনা হয়। এতে স্পষ্ট হয় যে আল্লাহ মানুষের দুর্বলতা জানতেন এবং সময়ের ব্যবধানে বিধান সহজ করেছেন।
ক্রমান্বয়ে বা ধাপে ধাপে বিধান জারি
আয়াত রহিতকরণের আরেকটি মূল উদ্দেশ্য ছিল সমাজকে বড় পরিবর্তনের জন্য ধাপে ধাপে প্রস্তুত করা। যেমন মদ চূড়ান্তভাবে হারাম করার আগে তিনটি ভিন্ন ধাপে আয়াত নাজিল হয়। প্রথমে সুরা বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াতে মদ ও জুয়ায় অপকারের কথা উল্লেখ করা হয়। এরপর সুরা নিসার ৪৩ নম্বর আয়াতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়। সর্বশেষে সুরা মায়িদার ৯০ নম্বর আয়াতে মদকে সম্পূর্ণ বর্জন ও শয়তানের কলুষিত কাজ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। দীর্ঘদিনের বদঅভ্যাস এক নিমেষে ত্যাগ করা কঠিন বলেই আল্লাহ সমাজকে পর্যায়ক্রমে প্রস্তুত করেছিলেন।
কিবলা পরিবর্তন ও আনুগত্যের পরীক্ষা
মুসলমানদের সালাতের কিবলা পরিবর্তনের ঘটনা নাসখের অন্যতম ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। শুরুতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিরা বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতেন। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে কাবার দিকে মুখ করে সালাতের নির্দেশ আসে। সুরা বাকারার ১৪৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি আগে যে কিবলার ওপর ছিলেন, তা এ উদ্দেশ্যেই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে প্রকাশ পায় কে রাসুলের অনুসরণ করে আর কে পেছনে ফিরে যায়।’ এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, ইবাদতের আসল ভিত্তি হলো আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, নিজের ব্যক্তিগত পছন্দ নয়।
রহিত করার বিষয়ে বিভ্রান্তি ও সতর্কতা
অনেকে মনে করেন নাসখ মানে আল্লাহর পূর্বের সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আসা। প্রকৃতপক্ষে মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ থাকায় মানুষকে পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎজুড়ে বিস্তৃত। চিকিৎসকের ওষুধ পরিবর্তনের মতোই, কোন বিধান কত দিন কার্যকর থাকবে তা আল্লাহর অনাদি জ্ঞানে আগেই নির্ধারিত থাকে।
তবে কোনো আয়াত বা বিধান রহিত হয়েছে কি না, তা ইচ্ছামতো নির্ধারণ করার সুযোগ নেই। দুই আয়াতের মধ্যে অর্থগত বৈষম্য দেখলেই একটিকে রহিত বলা ভুল। তাফসির ও শরিয়তের অকাট্য দলিলের ওপর ভিত্তি করেই কেবল রহিতকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। অন্যথায় ব্যাখ্যার মাধ্যমে আয়াতসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাই মুফাসসিরদের মূল নীতি।
সারসংক্ষেপে, পবিত্র কোরআনের বিধান রহিত হওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে মহান আল্লাহর প্রজ্ঞা ও বান্দার প্রতি অপরিসীম করুণার চিত্র ফুটে ওঠে। (তথ্যসূত্র: ফয়জুল্লাহ রিয়াদ, শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুণ সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা)।