সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
বিসমিল্লাহ বলার ফজিলত | হাদিসের ৪টি শিক্ষণীয় ঘটনা
ইসলামে প্রতিটি শুভ ও কল্যাণকর কাজ শুরুর আগে মহান আল্লাহর নাম স্মরণ করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, যা 'বিসমিল্লাহ' বলার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলিম উম্মাহকে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহ বলার শিক্ষা দিয়েছেন। হাদিসে বর্ণিত কিছু ঘটনা এর বরকত ও উপকারিতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিভাত হয়। এই ঘটনাগুলো আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর নাম নিয়ে কাজ শুরু করা একজন মুমিনের জীবনধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিম্নে হাদিসে উল্লিখিত চারটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরা হলো:
১. বিসমিল্লাহর বরকতে শয়তানের বমি
একদা এক ব্যক্তি খাবার খাচ্ছিলেন কিন্তু খাবারের শুরুতে তিনি বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গিয়েছিলেন। যখন তিনি খাবারের শেষ লোকমা মুখে তুলছিলেন, তখন বললেন, ‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু।’ যার অর্থ: ‘খাবারের শুরু ও শেষ আল্লাহর নামে।’ এই দোয়া শুনে রাসূল (সা.) মুচকি হাসলেন এবং বললেন, "শয়তানও তার সঙ্গে খাবার খাচ্ছিল। যখন সে আল্লাহর নাম স্মরণ করল, শয়তান তার পেটের ভেতরে যা ছিল, সব বমি করে বের করে দিয়েছে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৭৬৮)। এই ঘটনা খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলার গুরুত্ব বোঝায়। রাসূল (সা.) সাহাবি ওমর ইবনে আবু সালামা (রা.)-কে শিখিয়েছিলেন, "হে বৎস! আল্লাহর নাম নাও, ডান হাতে খাও এবং তোমার সামনে থেকে খাও।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৭৬)।
২. বিসমিল্লাহ না বলার প্রভাব
একবার রাসূলুল্লাহ (সা.) ছয়জন সাহাবির সঙ্গে খাবার খাচ্ছিলেন। এমন সময় একজন বেদুইন এসে খাবারে শরিক হলেন। তিনি তাড়াহুড়ো করে মাত্র দুই লোকমায় সমস্ত খাবার শেষ করে ফেললেন। তখন রাসূল (সা.) আফসোস করে বললেন, "যদি সে বিসমিল্লাহ বলত, তবে এই খাবার তোমাদের সবার জন্য যথেষ্ট হতো।" এরপর তিনি উপদেশ দিলেন, "তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, সে যেন (খাবারের শুরুতে) আল্লাহর নাম নেয়। আর যদি আল্লাহর নাম নিতে ভুলে যায়, তবে যেন বলে, “বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু।”" (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩২৬৪)। এই ঘটনা বিসমিল্লাহর বরকত এবং তা বাদ দেওয়ার পরিণাম স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। যত সামান্য খাবারই হোক না কেন, আল্লাহর নাম নিয়ে খাওয়া মুমিনের সুন্নাহসম্মত আদব।
৩. ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বিসমিল্লাহ
দৈনন্দিন জীবনে মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকে। অথচ এই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলার ওপর পূর্ণ ভরসা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া পড়ার শিক্ষা দিয়েছেন মহানবী (সা.)। দোয়াটি হলো: ‘বিসমিল্লাহি, তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।’ যার অর্থ: ‘আল্লাহর নামে বের হচ্ছি। আল্লাহর ওপরই ভরসা করলাম। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।’ এই দোয়া পাঠ করলে ফেরেশতারা তাকে সুসংবাদ দিয়ে বলেন, "তোমাকে সঠিক পথ দেখানো হয়েছে, তোমার জন্য যথেষ্ট করা হয়েছে এবং তোমাকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।" অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দাকে সঠিক পথপ্রদর্শন, সাহায্য ও সুরক্ষার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর শয়তান তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪২৬)। এই দোয়ায় বিসমিল্লাহর পাশাপাশি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল বা নির্ভরতার ঘোষণা রয়েছে, যা আত্মিক সুরক্ষা ও কল্যাণের জন্য অপরিহার্য।
৪. শয়তানের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা
দাম্পত্য জীবনেও শয়তানের ক্ষতি থেকে সুরক্ষার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেন, "কেউ স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগে যদি এই দোয়া পড়ে: ‘বিসমিল্লাহি, আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইতানা, ওয়া জান্নিবিশ শাইতানা মা রাজাকতানা।’ যার অর্থ: ‘আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ, আমাদের শয়তান থেকে দূরে রাখুন এবং আপনি আমাদের যে সন্তান দান করবেন, তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখুন।’ এরপর তাঁদের জন্য সন্তান নির্ধারিত হলে শয়তান কখনো তার ক্ষতি করতে পারবে না।" (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৮৮)। হাদিসে বর্ণিত এই সুরক্ষা শয়তানের আধ্যাত্মিক ক্ষতি থেকে মুক্তির সুসংবাদ। এর মানে এই নয় যে, সন্তান কখনো অসুস্থ হবে না বা দুনিয়াবি কোনো বিপদে পড়বে না; বরং এটি সন্তান লাভের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা দেয়।
একজন মুমিনের উচিত দৈনন্দিন জীবনের সকল বৈধ ও কল্যাণকর কাজ আল্লাহ তাআলার নাম নিয়ে শুরু করা এবং কেবল মুখে উচ্চারণ নয়, অন্তরেও তাঁর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভরতা রাখা। কারণ, প্রকৃত বরকত ও কল্যাণের একমাত্র মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা।