সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
দ্বিতীয় পদ্মা সেতু | দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরের নতুন দিগন্ত
পদ্মা নদী শুধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়, এটি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের এক দীর্ঘ পরীক্ষাও বটে। একসময় পদ্মার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত ছিল অনিশ্চয়তা আর ভোগান্তির প্রতিচ্ছবি, যা প্রথম পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনেছে। এখন সময় এসেছে পদ্মার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ করিডরকে নতুন সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করার, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিতে পারে।
সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। এই বৈঠকে ওয়াই-আকৃতির সংযোগব্যবস্থাসহ বিভিন্ন কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দ্বিতীয় পদ্মা ও দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বর্তমানে চলমান রয়েছে এবং আগামী বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে তা শেষ হওয়ার কথা। সমীক্ষা প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সেতুর চূড়ান্ত অবস্থান, নকশা ও প্রকল্প ব্যয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন, নদীর গতিপ্রকৃতি, পরিবেশগত প্রভাব, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন, সংযোগ সড়ক, রেল যোগাযোগ, নির্মাণ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল—সবকিছুর সমন্বিত মূল্যায়ন অপরিহার্য। তাই সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ফলাফলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রস্তাবিত দৌলতদিয়া–পাটুরিয়া করিডরকে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর অন্যতম সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হবে। একটি সেতু কেবল নদী পারাপারের মাধ্যম নয়, এটি সময় বাঁচায়, পরিবহন ব্যয় কমায়, বাজার সম্প্রসারিত করে, বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ায় এবং কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাতে সাহায্য করে। এর ফলে অর্থনীতির নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়।
প্রথম পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে গতি এসেছে, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু সেই ধারাকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আরও বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলবে। এটি শুধু ভৌগোলিক দূরত্বই কমাবে না, বরং মানুষের মানসিক দূরত্বও ঘুচিয়ে দেবে। বিশেষত, এই সেতু বাস্তবায়িত হলে মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং বেনাপোল ও দর্শনা স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানীর বিকল্প ও দ্রুত যোগাযোগ স্থাপিত হবে, যা দেশের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করবে।
তবে শুধু সেতু নির্মাণই যথেষ্ট নয়। সেতুর দুই প্রান্তের সংযোগ সড়ক, মহাসড়কের সক্ষমতা বৃদ্ধি, রেল যোগাযোগ, লজিস্টিকস, বন্দর অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল এবং নগর পরিকল্পনাকে একটি সমন্বিত প্যাকেজ হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। একটি আধুনিক সেতু যদি দুর্বল সংযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অধরা থেকে যাবে। তাই দ্বিতীয় পদ্মা সেতুকে একটি বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে, বরং একটি সমন্বিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডরের অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
এই সেতু ঢাকার বিনিয়োগকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আকৃষ্ট করবে, স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং আঞ্চলিক শহরগুলোর গুরুত্ব বৃদ্ধি করবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন কীভাবে একটি অঞ্চলের ভূগোল বদলে দিতে পারে, প্রথম পদ্মা সেতু তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয় পদ্মা সেতুও একইরকম বহুমাত্রিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা বহন করছে।
দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এই সেতু। তাদের কাছে এটি কেবল একটি জাতীয় প্রকল্প নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য প্রয়োজন। তাই দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে প্রকৌশলগত বাস্তবতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও পরিবেশগত বিবেচনার ভিত্তিতে বাস্তববাদী অগ্রগতি অত্যন্ত জরুরি।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাক্ষর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইম, বিশ্বাস করেন যে যথাযথ পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা এবং বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন কৌশল থাকলে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠবে। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্র উন্মোচন করবে, যা দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে মানুষের জীবনকে সহজ করে, অর্থনীতিকে গতিশীল করে এবং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।