সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গঠন | ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ
একটি রাষ্ট্রের সার্বিক অগ্রগতি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না; বরং নাগরিকদের কর্মক্ষমতা, নৈতিক মূল্যবোধ ও তরুণ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। বর্তমান সময়ে এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার। মাদকাসক্তি কেবল একটি মানুষের জীবনকে বিপন্ন করছে না, বরং পারিবারিক শান্তি ধ্বংসের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনিভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দেশের প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মাদক ও ধূমপানের কারণে প্রতিবছর ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এর ফলে বহু কর্মক্ষম মানুষ দৈনন্দিন পেশাজীবন থেকে ছিটকে পড়ছে, যা সামগ্রিক জাতীয় উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
অপরাধের বিস্তারের পেছনেও অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মাদক। আসক্তির অর্থের জোগাড় করতে গিয়ে অনেকেই চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও সহিংসতার পথ বেছে নিচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মাদক নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুরে ১৯৭৩ সালের 'মিসইউস অব ড্রাগস অ্যাক্ট'-এর মাধ্যমে মাদক পাচারে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করে সফলভাবে অপরাধ দমন করা সম্ভব হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের 'ওয়ার অন ড্রাগস' এবং ফিলিপাইনের বিতর্কিত মাদকবিরোধী অভিযানের মতো আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, কেবল আইন প্রয়োগ বা সাময়িক অভিযানই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আনে না। বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ ও মানব অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, যা ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
বাংলাদেশের পেক্ষাপটে মাদক নির্মূলে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ করা, শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং শীর্ষ মাদক কারবারিদের বিচার সুনিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে যোগদান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও গাড়িচালকদের ক্ষেত্রে কার্যকর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে না দেখে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং একই সঙ্গে শীর্ষ গডফাদারদের আইনের আওতায় আনাই একটি মাদকমুক্ত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথ সুগম করবে।