সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
মেহেরপুরে জামায়াতের ১১ দফা দাবি | সার ডিলার নিয়োগ, হাসপাতাল সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রমে দলীয়করণ, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, মাদক ব্যবসা এবং চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ তুলে ১১ দফা দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মেহেরপুর জেলা শাখা। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জামায়াতে ইসলামী মেহেরপুর জেলা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইকবাল হুসাইন। তিনি অভিযোগ করেন, সম্প্রতি মেহেরপুরে ২২ জন সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদণ্ড উপেক্ষা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং তাদের স্বজনদের নাম রয়েছে, যা নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও মনোনীত ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তার বক্তব্যে মেহেরপুর সদর, মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলার ২২টি ডিলারশিপের তালিকা তুলে ধরে সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি নাজমুল হক লিটনের বরাত দিয়ে বলা হয়, তার ছোট ভাই দীর্ঘদিনের সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও ডিলারশিপ পাননি, অথচ কুতুবপুরে উপজেলা বিএনপির সভাপতির ভাই ডিলারশিপ পেয়েছেন। মেহেরপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহী সদস্য আনোয়ারুল হক কালুর বক্তব্য উদ্ধৃত করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়।
জামায়াত নেতারা ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগেও দলীয়করণের অভিযোগ করেছেন। তাদের মতে, প্রকৃত উপকারভোগীর পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্ব বণ্টন করা হলে কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। একইসঙ্গে ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রদানের তালিকা তৈরিতে স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্যের অভিযোগ তুলে প্রকৃত দায়িত্বপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্তির দাবি জানানো হয়।
মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালকে ঘিরে দালালচক্র, রোগী হয়রানি, পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অবৈধ অর্থ আদায় এবং চিকিৎসাসেবায় সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগও আনা হয়েছে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, হাসপাতাল থেকে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানোর প্রবণতা প্রকট। এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত ও কার্যকর নজরদারির দাবি জানানো হয়। এমনকি, এক দালাল আটকের পর রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়।
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা প্রসঙ্গে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, মেহেরপুরে মারামারি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এসব অপরাধের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন মহলের পৃষ্ঠপোষকতা আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়। মাদক ব্যবসা ও অবৈধ জুয়ার সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়।
ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দলীয় পরিচয়ে চাঁদা দাবি ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরে জামায়াত নেতারা জানান, গত ২৭ অক্টোবর মেহেরপুর শহরের বিএডিসির সামনে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তারিকুল ইসলাম নামের এক পরিবহন ও সবজি লোডিং ব্যবসায়ীকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় ছাত্রদল নেতা সানি এবং সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ভাই যুবদল নেতা মিঠুনের নেতৃত্বে হামলার অভিযোগ করা হয়। আহত ব্যবসায়ীকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এছাড়া, শহরের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায় এবং একটি কথিত টর্চার সেলে ব্যবসায়ীদের জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়।
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াত নেতারা। তাদের অভিযোগ, সরকারি অনুষ্ঠান, উন্নয়ন কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ ও রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে সরকারি সেবা প্রদানে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
আগামীকাল শনিবার ঢাকা থেকে খুলনাগামী লংমার্চের অংশ হিসেবে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য সমাপনী সমাবেশে মেহেরপুর জেলা থেকে নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ লংমার্চের ৭ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধ।
এছাড়াও, জামায়াতের উত্থাপিত ১১ দফা সুনির্দিষ্ট দাবির মধ্যে রয়েছে সার ডিলার নিয়োগের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে বৈষম্য বন্ধ, হাসপাতালের দালালচক্র ও সিন্ডিকেট নির্মূল, কিশোর গ্যাং দমন, মাদক ও অবৈধ জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজ উদ্দীন খান ও মেহেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য নাজমুল হুদা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য তাজ উদ্দীন খান বলেন, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সংসদের বাইরে আমরা জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। একটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। সরকার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করুক, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। তবে জনগণের অধিকারও বাস্তবায়ন করতে হবে। সার, তেল ও গ্যাসসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে নিশ্চিত করে সরকার তার মেয়াদ পূর্ণ করুক, এটাই আমাদের চাওয়া। তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, সরকারের বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও জোরালো ও গতিশীল হবে।
এসময় জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. ইকবাল হুসাইন, সদর উপজেলা আমির সোহেল রানা, পৌর আমির সোহেল রানা ডলার, মুজিবনগর উপজেলা আমির খান জাহান আলী, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের জেলা সভাপতি আব্দুর রউফ মুকুল, মুজিবনগর উপজেলা সেক্রেটারি মো. খাইরুল বাশারসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।