সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
প্রশাসনে দুর্নীতি ও অনিয়ম রুখতে বদলি-পদায়নে লটারি পদ্ধতি চালু
বিশেষ প্রতিনিধি: সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, পদায়ন এবং পছন্দের কর্মস্থলে বদলিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থ ও তদবিরনির্ভর বাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। ক্ষমতার রদবদল হলেও এই সুবিধাভোগী চক্র সক্রিয় থাকে, যা প্রশাসনের স্বচ্ছতা বিনষ্ট করার পাশাপাশি সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে। অনৈতিক পন্থায় বা বিপুল অর্থের বিনিময়ে কাঙ্ক্ষিত পদে আসীন হওয়ার পর সেবা নিশ্চিত করার চেয়ে বিনিয়োগকৃত অর্থ তুলে আনাই অনেকের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, যা দুর্নীতির বিষবৃক্ষকে আরও বিস্তৃত করে।
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণার পর প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ফেরানো এবং বদলি বাণিজ্য বন্ধে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলিতে এই লটারি প্রক্রিয়া চালু করা প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গুলশান, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জ ও রূপগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পদায়নের ক্ষেত্রে অতীতে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ উঠত। নিরপেক্ষ লটারি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই অপচর্চা রোধ করা সম্ভব হতে পারে।
তবে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার পদেই নয়, স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, ব্যাংক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো সংবেদনশীল খাতগুলোতেও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে থানায় ওসির পদায়ন কিংবা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শহরে বদলির ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধার লেনদেন সাধারণ জনসেবাকে ব্যাহত করে। একই কথা প্রযোজ্য বিচার বিভাগ, সড়ক ও জনপথ, গণপূর্ত এবং বন বিভাগের মতো সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রেও। কোনো পদে বসতে ঘুষ দিলে সেই কর্মকর্তার ওপর সততা বজায় রাখার নৈতিক চাপ কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।
ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পদে লটারি ব্যবস্থার প্রয়োগ শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনিক পদায়নের আগে সততা, অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার একটি সূচক তৈরি করে তার ভিত্তিতে সমযোগ্যতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের মধ্যে লটারি আয়োজন করা যেতে পারে। এতে অনৈতিক তদবিরের সুযোগ কমবে এবং যোগ্য কর্মকর্তারা মূল্যায়িত হবেন। তবে কারিগরি বা বিশেষায়িত পদের ক্ষেত্রে পুরোপুরি লটারির ওপর নির্ভর না করে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বহাল রাখা প্রয়োজন।
দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে কেবল প্রশাসনিক শাস্তিই যথেষ্ট নয়; অনিয়মের পথগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করাই এখন সময়ের দাবি। লটারি পদ্ধতি যদি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, কারসাজিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা সরকারি প্রশাসনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনসেবার মান বাড়াতে একটি কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠবে।