সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
কালের গর্ভে বিলীন ঐতিহ্যবাহী তালপাতার হাতপাখা | একজন জোহরা বেগমের লড়াই
একসময় ‘তোমার হাতপাখার বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে আসে…’ গানটি শুধু একটি সুর নয়, ছিল বাংলার জনজীবনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তীব্র গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা বৈদ্যুতিক পাখার অস্তিত্ব ছিল না, তখন তালপাতার হাতপাখা ছিল স্বস্তির একমাত্র অবলম্বন। রাজপ্রাসাদ থেকে কৃষকের কুঁড়েঘর, সর্বত্রই ছিল এর সমান কদর। প্রযুক্তির অবিরাম অগ্রযাত্রায় হাজার বছরের এই লোকঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। তবে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার আনন্দপুর গ্রামের জোহরা বেগমের হাতে আজও টিকে আছে বাংলার এই প্রাচীন শিল্পকর্মের ধারা।
ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে তালপাতা ও প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি হাতপাখার ব্যবহার দুই সহস্রাধিক বছরের পুরোনো। প্রাচীন বাংলা, মগধ ও গৌড় অঞ্চলের দৈনন্দিন জীবনে তাল, খেজুর ও বাঁশের তৈরি পাখা ছিল অপরিহার্য। পাল ও সেন যুগে রাজদরবার, বৌদ্ধ বিহার এবং হিন্দু মন্দিরে রাজা, গুরু ও অতিথিদের বাতাস করার জন্য এর ব্যবহার প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে সুলতানি ও মুঘল আমলেও রাজা-বাদশাহ ও জমিদারদের দরবারে দাস-দাসীরা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতেন। ধীরে ধীরে অভিজাত সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে এটি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে তালপাতার হাতপাখা কেবল গরম নিবারণের উপকরণ ছিল না, বরং ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এককালে নববধূকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর সময় খাট, আলমারি, কাঁথা-বালিশ ও পিতলের তৈজসপত্রের পাশাপাশি নকশা করা তালপাতার হাতপাখাও দেওয়া হতো। অতিথি আপ্যায়ন, ধর্মীয় মাহফিল, ঈদগাহ, মসজিদ, মন্দির, গ্রামীণ সালিশ, পাঠশালা কিংবা কৃষকের মাঠের বিশ্রাম – সবখানেই হাতপাখার ব্যবহার ছিল অনিবার্য। বিদ্যুৎহীন গ্রীষ্মের রাতগুলোতে পরিবারের একজন সদস্য অন্যদের বাতাস করতেন এই হাতপাখা দিয়ে, যা ছিল বাংলার পারিবারিক জীবনের এক চিরচেনা চিত্র।
তালপাতার হাতপাখা তৈরির প্রক্রিয়াটিও এক ধরনের লোকশিল্প। প্রথমে পরিপক্ব তালপাতা সংগ্রহ করে কয়েকদিন রোদে শুকানো হয়। এরপর পাতাগুলো সমান করে কেটে বাঁশ বা বেতের চিকন কাঠামোর সঙ্গে নিপুণভাবে বসানো হয়। শক্ত সুতা দিয়ে চারপাশে সেলাই করে নানা নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। সবশেষে বাঁশ বা কাঠের হাতল লাগিয়ে তৈরি হয় একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব হাতপাখা। প্রতিটি পাখা তৈরিতে প্রয়োজন হয় ধৈর্য, অভিজ্ঞতা এবং দক্ষ হাতের স্পর্শ।
একসময় কমলনগরসহ উপকূলীয় অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার এই পাখা তৈরি করে বাড়তি আয় করত। স্থানীয় হাট-বাজার, বিভিন্ন মেলা এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে এসব পাখার ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক পাখা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে সেই চাহিদা এখন প্রায় বিলীন। ফলস্বরূপ, একের পর এক কারিগর এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে অন্য জীবিকায় যুক্ত হচ্ছেন। তবে ব্যতিক্রম আনন্দপুর গ্রামের জোহরা বেগম। তিনি দীর্ঘকাল ধরে নিজ হাতে তালপাতার ঐতিহ্যবাহী পাখা তৈরি করে চলেছেন। তার বিশ্বাস, এটি শুধু একটি পণ্য নয়, এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকঐতিহ্যের এক জীবন্ত স্মারক। আধুনিকতার স্রোতে বিলীন হতে বসা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে তিনি এখনো নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।
লোকসংস্কৃতি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ সুবিধা এবং কার্যকর বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তালপাতার হাতপাখা আবারও দেশীয় হস্তশিল্প হিসেবে নতুন পরিচিতি লাভ করতে পারে। অন্যথায়, বাংলার হাজার বছরের এই ঐতিহ্য অচিরেই কেবল বইয়ের পাতায় এবং স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
ঐতিহ্যবাহী শিদল তৈরির কৌশল ও এর পেছনের ইতিহাস
২ দিন আগে
সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী, লেখক, ও চিকিৎসক ডা. আবদুস সাত্তারের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন
১ সপ্তাহ আগে
অবহেলা আর ঔদাসীন্যে হারিয়ে যাচ্ছে আলমডাঙ্গার গর্বের স্থাপনাগুলি
২ সপ্তাহ আগে