লগইন
কবি নজরুলের দার্শনিক সত্তা
বড় করে দেখুন
খাইরুল ইসলাম: নিজস্ব প্রতিবেদক আপডেট: ২৩ মে, ২০২৬ | ০৪:৫৯ দুপুর ৪১১ বার পঠিত
ফন্ট সাইজ:

সংবাদ শুনুন

প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন

কবি নজরুলের দার্শনিক সত্তা

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁকে আমরা ভালোবেসে “বিদ্রোহী কবি” বলে ডাকি। কিন্তু তাঁর পরিচয় শুধু এই একটি উপাধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, লেখক, গায়ক, সৈনিক, অভিনেতা, সুরকার, সাংবাদিক এবং সর্বোপরি একজন মানবতাবাদী দার্শনিক। তাঁর রচনার প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি ছন্দে, প্রতিটি গানে ফুটে উঠেছে এক শক্তিশালী ও মানবিক দর্শনের প্রতিফলন।

 মানবতাবাদী দর্শন

নজরুলের দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল মানবতাবাদ। তিনি মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, জাতি-ধর্ম-বর্ণের বিভাজন এসবের বিরুদ্ধে ছিলেন কঠোর। তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে এই বার্তা সব মানুষ সমান, সবাই ঈশ্বরের সৃষ্টি। নজরুল লিখেছেন:

“গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে সব কালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”

এই সাম্যবাদী চিন্তা ছিল তাঁর দর্শনের অন্যতম স্তম্ভ। তিনি ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভেদে বিশ্বাস করতেন না।

তাই তো তিনি লিখেছেন-

“গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হ’য়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।
গাহি সাম্যের গান!”

মুসলিম হয়েও তিনি বিয়ে করেছিলেন হিন্দু ঘরে। নিজের সন্তানদের নাম রেখেছিলেন হিন্দু-মুসলিম উভয় ধর্মের মহামানবের নামে। তিনি হিন্দু দেব-দেবীর বন্দনায় গান লিখেছেন, আবার হিন্দুদের উদ্দেশ্যেও ইসলামিক ভাবনার গান রচনা করেছেন। তাঁর মতে, প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে মানবতা।

তিনি আবারও তাঁর কবিতায় লিখলেন-

“মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির-কাবা নাই।”

নজরুল মানবাধিকার নিয়ে সচেতন ছিলেন। তিনি তাঁর কবিতায় মানবাধিকার নিয়ে লিখেছেন-

“দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সাব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?”

কবি নজরুল আইনস্টাইনের গতিবিদ্যার তৃতীয় সূত্র ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে’ ও ইসলাম ধর্মের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা করেছেন কবিতার ভাষায়। তিনি লিখেছেন-

“যুগের ধর্ম এই
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।
শোন মর্তের জীব!
অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে তত হবে ক্লীব।”

 বিদ্রোহ ও মুক্তির দর্শন

নজরুলের দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্রোহ। তবে এটি কোনো অন্ধ বা ধ্বংসাত্মক বিদ্রোহ নয়; এটি ছিল অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও দাসত্বের বিরুদ্ধে এক সচেতন সংগ্রাম। ১৯২২ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত কবিতা “বিদ্রোহী” বাংলা সাহিত্যে এক বিপ্লবের সূচনা করেছিল। তিনি লিখেছিলেন:

“আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দলে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!”

এই বিদ্রোহ ছিল সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে; হোক তা বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ, সমাজের কুসংস্কার, নারীর প্রতি অবমাননা বা ধর্মীয় সংকীর্ণতা। নজরুল বিশ্বাস করতেন, ব্যক্তি ও সমাজের সত্যিকার মুক্তি আসবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমে।

ধর্মীয় সহাবস্থানের দর্শন

কাজী নজরুল ইসলাম ইসলামের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, তবে তা ছিল উদার, সহনশীল ও মানবিক। তিনি ধর্মকে বিভেদের নয়, মিলনের মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। তিনি লিখেছেন:

“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।”

এই একতা ও সম্প্রীতির বার্তা ছিল তাঁর দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সকল ধর্মের মূল উদ্দেশ্যই মানুষের কল্যাণ। তাই তিনি কোরআন, বাইবেল, বেদ, গীতা সব ধর্মগ্রন্থকেই শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। তিনি লিখেছেন:

“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!”

নারীমুক্তির দর্শন

কাজী নজরুল নারীর প্রতি সমাজের অবহেলা, অন্যায় ও অসম আচরণের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁর রচনায় নারী কেবল প্রেমিকা বা মা নয়, বরং একজন সংগ্রামী, সাহসী ও স্বাধীন মানুষ। তাঁর কবিতা “নারী” তে তিনি বলেন:

“সাম্যের গান গাই-
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোন ভেদাভেদ নাই!
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।
নরকুণ্ড বলিয়া কে তোমা’ করে নারী হেয়-জ্ঞান?
তারে বলো আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর শয়তান।”

নারীর অধিকার, মর্যাদা ও আত্মমর্যাদার পক্ষে তিনি ছিলেন এক বলিষ্ঠ কণ্ঠ। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীর মুক্তি ছাড়া সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি লিখেছেন:

“কোন রণে কত খুন দিল নর লেখা আছে ইতিহাসে
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে।
কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়ি, কত বোন দিল সেবা,
বীরের স্মৃতিস্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
কোন কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারী,
প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়ী লক্ষ্মী-নারী।
রাজা করিতেছে রাজ্য শাসন, রাজারে শাসিছে রাণী,
রাণীর দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।”

নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় আর কোন কবি এভাবে লিখতে পেরেছেন? পারেনি।

শিল্প ও সংস্কৃতির মুক্ত দর্শন

নজরুল ছিলেন সংস্কৃতির এক মুক্ত চিন্তার প্রবক্তা। তিনি একদিকে যেমন আরবী-ফার্সী প্রভাবযুক্ত ইসলামি সংগীত রচনা করেছেন, তেমনি হিন্দু পুরাণ ও সংস্কৃতি অবলম্বনে অনেক গীতিনাট্য, কাব্য ও গান লিখেছেন। এই বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর দর্শনের অংশ। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ, যেখানে সব ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতির মানুষ একসাথে বাঁচবে, একে অন্যের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করবে। হিন্দুয়ানি বা মুসলমানি শব্দ বলে কোন ভাষাকে ছোট করা যাবে না।

শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষের দর্শন

নজরুল ছিলেন নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের কবি। তাঁর কণ্ঠ ছিল শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের পক্ষে উচ্চারিত এক বজ্রধ্বনি। তিনি লিখেছেন:

“আমার কবিতা আমি লিখেছি মজুরের রক্ত দিয়ে,
আমার গান আমি গেয়েছি চাষার হৃদয় দিয়ে।”

এই শ্রেণি-সচেতনতা নজরুলকে কেবল সাহিত্যিক নয়, এক বাস্তববাদী দার্শনিক রূপে গড়ে তোলে। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ, যেখানে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য থাকবে না।

 তাই তো তিনি লিখতে পেরেছিলেন-

“পরোয়া করি না, বাঁচি বা না- বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথার ওপর জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো- যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!”

সাহিত্য ও সংগীতের মাধ্যমে আত্মবিকাশের দর্শন

নজরুলের দর্শনে আত্মবিকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য ও সংগীতের মাধ্যমে মানুষ নিজেকে চেনার সুযোগ পায়। তাঁর গান বিশেষ করে নজরুলগীতি এমন এক সুর ও বাণীর সংমিশ্রণ, যা মানুষকে উদ্বেলিত করে, জাগিয়ে তোলে। তিনি বলেন:

“আমি গান গাই,
এই গান গেয়ে আমি বাঁচতে চাই,
মরার আগে মরতে চাই না আমি।”

এই আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা ও সৃজনশীলতাই নজরুলের দর্শনকে প্রাণবন্ত করেছে।

কাজী নজরুল ইসলাম একই সাথে বিপ্লবী ও প্রেমিক। তিনি লিখেছেন-

“আমি ইন্দ্রানী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ তূর্য।”

তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক ক্ষণজন্মা বিপ্লবী, যিনি কলম, কণ্ঠ ও কর্ম দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর দর্শন ছিল এক গভীর মানবিক চেতনায় পূর্ণ যেখানে বিদ্রোহ আছে, কিন্তু তা ভালোবাসার জন্য; যেখানে ধর্ম আছে, বিভেদের নয়, মিলনের জন্য; যেখানে সাহিত্য আছে, কিন্তু তা শুধু বিনোদনের জন্য নয়, বরং সমাজ গড়ার জন্য।

আজকের এই অস্থির ও বিভক্ত সমাজে নজরুলের দর্শন আমাদের জন্য একটি দিশারী হতে পারে। তাঁর চিন্তা, তাঁর কর্ম, তাঁর লেখা, তাঁর গান সবকিছুই আমাদের শেখায় কীভাবে একজন ব্যক্তি সত্যিকারের মানবতাবাদী, মুক্তচিন্তক ও সাহসী মানুষ হয়ে উঠা যায় । সবশেষে তাঁরই ভাষায় বলি-

“আমি ধূমকেতু!
ঝরিয়া পড়িবে আশার আলো জাগায়ে
নতুন পৃথিবী গড়ার শপথে!”

সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?

মন্তব্য (০)

মন্তব্য করতে লগইন করুন

লগইন করুন

সর্বশেষ সংবাদ

পঁচাত্তরেও পাদুকা মেরামতের কাজ ছাড়েননি

৪ ঘন্টা আগে
পঁচাত্তরেও পাদুকা মেরামতের কাজ ছাড়েননি

যুক্তরাজ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন

৪ ঘন্টা আগে
যুক্তরাজ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন

মুজিবনগরে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে যুবদল নেতাসহ আহত ৩

৫ ঘন্টা আগে
মুজিবনগরে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে যুবদল নেতাসহ আহত ৩

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও ভিন্নমত প্রকাশের পথ সুগম করার তাগিদ

৫ ঘন্টা আগে
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও ভিন্নমত প্রকাশের পথ সুগম করার তাগিদ

আলমডাঙ্গায় ফিরোজা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও লোকমান হোসেন প্রাইভেট হাসপাতালে ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা : দুইটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ

১৮ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় ফিরোজা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও লোকমান হোসেন প্রাইভেট হাসপাতালে ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা : দুইটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ

আনন্দ-অশ্রুতে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

১৮ ঘন্টা আগে
আনন্দ-অশ্রুতে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

আলমডাঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

১৯ ঘন্টা আগে
আলমডাঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো শারদীয় দুর্গোৎসব

দামুড়হুদায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আ.লীগ নেতা মামুন গ্রেপ্তার

২১ ঘন্টা আগে
দামুড়হুদায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আ.লীগ নেতা মামুন গ্রেপ্তার

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন চেষ্টার অভিযোগে মাদরাসাশিক্ষক কারাগারে

২২ ঘন্টা আগে
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন চেষ্টার অভিযোগে মাদরাসাশিক্ষক কারাগারে

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জামায়াতের

২২ ঘন্টা আগে
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জামায়াতের

নোটিফিকেশন চালু করুন

সর্বশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো সবার আগে পেতে নোটিফিকেশন চালু করে রাখুন।