সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের নীরব আগ্রাসন | রক্ত, নাড়ি ও ফুসফুসে অদৃশ্য বিপদ
গবেষণাগারের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে প্রতিদিন এক অদৃশ্য জগতের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে। যে জগত খালি চোখে অদৃশ্য হলেও পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে ইদানীং এই অণুবীক্ষণ যন্ত্রে এমন কিছু সত্তা ধরা পড়ছে, যা প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট নয়, বরং মানুষেরই তৈরি। এই অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলো বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ ও ‘ন্যানোপ্লাস্টিক’ নামে পরিচিত।
প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা আজ বিশ্বজুড়ে এক গভীর উদ্বেগের কারণ। চিন্তার বিষয় হলো, প্লাস্টিক এখন আর কেবল বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যার মতো নদীগুলোতে দৃশ্যমান বর্জ্য হিসেবে ভেসে থাকছে না। এটি প্রাণ ও পরিবেশ উভয়কেই তার থাবা থেকে রেহাই দিচ্ছে না। নদীর পলি, সাগরের মাছ, ঘরের ধূলিকণা এবং এমনকি বাতাস ভেদ করে এই কণাগুলো আমাদের পরিপাকতন্ত্র, ফুসফুস এবং সরাসরি রক্তপ্রবাহেও স্থান করে নিয়েছে।
ইতিমধ্যেই মানুষের রক্ত ও বুকের দুধে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী মানুষের নাড়ি ও ধমনিতেও এই অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার সন্ধান পেয়েছেন। মানবস্বাস্থ্যের ওপর মাইক্রোপ্লাস্টিকের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
স্পেনের বার্সেলোনার অটোনোমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের আরেকটি গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তাদের মতে, চায়ের টি-ব্যাগ থেকেও ক্ষতিকারক মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা তৈরি হয়। পলিমার-ভিত্তিক উপাদান দিয়ে তৈরি বাণিজ্যিক টি-ব্যাগগুলো ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার অন্যতম উৎস, যা থেকে কোটি কোটি প্লাস্টিক কণা পরিবেশে উন্মুক্ত হচ্ছে এবং শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
পলিথিনের স্তূপ বা সমুদ্রে ভেসে থাকা প্লাস্টিক বোতলের চেয়েও বহুগুণ বিপজ্জনক এই অদৃশ্য কণাগুলো। মানুষের অজান্তেই শরীরে এক নীরব আক্রমণ চালাচ্ছে, যার দীর্ঘস্থায়ী ফলস্বরূপ আমরা ভুগছি নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রাণঘাতী ব্যাধিতে।
চোখের আড়ালের বিজ্ঞান: মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?
সহজ ভাষায়, ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট যেকোনো কঠিন প্লাস্টিক কণাকে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বলা হয়। যখন এর আকার মানব কোষের চেয়েও অনেক গুণ ক্ষুদ্র (১ মাইক্রোমিটারের কম) হয়ে যায়, তখন তাকে ‘ন্যানোপ্লাস্টিক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এগুলো প্রধানত দুটি উপায়ে পরিবেশে প্রবেশ করে:
- প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক: শিল্পকারখানায় সরাসরি ক্ষুদ্র আকৃতিতে এগুলো তৈরি হয়। ফেসওয়াশ, টুথপেস্টে ব্যবহৃত ‘মাইক্রোবিড’ অথবা সিনথেটিক কাপড়ের ফাইবার এর উদাহরণ। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর গবেষণা অনুযায়ী, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সংস্থাটির গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করা হয়।
- মাধ্যমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক: রোদে, বাতাসে ও পানির চাপে প্রকৃতিতে ফেলে দেওয়া পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল বা গাড়ির টায়ার ভেঙে কোটি কোটি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হওয়ার মাধ্যমে এগুলো তৈরি হয়। পরিবেশের সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের উৎস হলো মাধ্যমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক।
একটি প্লাস্টিক বোতল শত শত বছর ধরে অবিকৃত থাকতে পারে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে সেটি ভেঙে কোটি কোটি সূক্ষ্ম কণায় রূপান্তরিত হয়ে মাটি, পানি ও বাতাসে মিশে যায়। এই অদৃশ্য ঘাতকের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।