সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
১৯৭৮ থেকে আজকের চীন | অর্থনৈতিক উত্থানের গল্প ও বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
১৯৭৮ সালের দিকে চীন এবং বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রায় একই পর্যায়ে ছিল—তখন তা ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। তবে আজকের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো উন্নয়নশীল অর্থনীতির বহুমুখী সীমাবদ্ধতার সঙ্গে সংগ্রাম করে চলেছে।
এই বিশাল পরিবর্তন নিশ্চয়ই একদিনে হয়নি। চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি মূলত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ধারাবাহিক সংস্কার, সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ এবং সুচিন্তিত শিল্পনীতির সুফল।
১৯৭৮ সালের পর চীন তাদের কৃষি খাতে প্রথম বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। মাও-যুগের 'পিপলস কমুউন' ব্যবস্থার পরিবর্তে ধীরে ধীরে চালু হয় 'হাউসহোল্ড রেসপনসিবিলিটি সিস্টেম'। এই ব্যবস্থায় জমির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে থাকলেও কৃষক পরিবারকে জমি ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি অধিকার দেওয়া হয়। কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের একটি নির্দিষ্ট অংশ রাষ্ট্রকে দেওয়ার পর অতিরিক্ত উৎপাদন নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার বা বাজারে বিক্রি করার সুযোগ পেত। এর ফলে কৃষকদের মধ্যে অধিক উৎপাদনের জন্য একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রণোদনা তৈরি হয়—বেশি উৎপাদন মানে বেশি আয়।
কৃষি সংস্কারের সফলতার পর চীনের মনোযোগ যায় শিল্পায়নের দিকে। ১৯৮০ সালে শেনজেন, জুহাই, শান্তউ এবং শিয়ামেনকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (Special Economic Zone) হিসেবে গড়ে তোলা হয়। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানিমুখী উৎপাদন এবং তুলনামূলক সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে চীন ধীরে ধীরে বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্রে (manufacturing hub) পরিণত হয়। তবে চীনের এই সাফল্যকে শুধু 'সস্তা শ্রমের গল্প' বললে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
চীন একই সঙ্গে সড়ক, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পাঞ্চলে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করেছে। একটি কারখানা থেকে পণ্য উৎপাদনের পর তা দ্রুত বন্দরে পৌঁছানো, এবং সেখান থেকে জাহাজে বিদেশে পাঠানো—পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে (supply chain) কার্যকর করার জন্য দেশটি নিরলস কাজ করেছে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ চীনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক প্রায় ৪৮ হাজার কিলোমিটারে পৌঁছেছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি কন্টেইনার বন্দরের মধ্যে সাতটিই চীনে অবস্থিত। এই সুবিশাল অবকাঠামো শুধু মানুষের যাতায়াত সহজ করেনি, শিল্প ও বাণিজ্যের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
চীনের আরেকটি বড় অর্জন হলো দারিদ্র্য হ্রাস। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত চার দশকে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। একই সময়ে নগরায়ণও দ্রুত গতিতে বেড়েছে। ১৯৭৮ সালে চীনের শহুরে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ; বর্তমানে তা প্রায় ৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
২০১২ সালের পর শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নিম্নপর্যায়ের অনেকেই তদন্ত ও শাস্তির আওতায় আসেন। একই সময়ে চীন শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে থাকে।
এর ফলাফল আজ সুস্পষ্ট। চীনের অর্থনীতি এখন প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে চীন বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। প্রযুক্তি, ব্যাটারি, সোলার প্যানেল, ইলেকট্রনিক্স এবং উৎপাদন সরবরাহ শৃঙ্খলে দেশটির প্রভাব ব্যাপক।
অবশ্য চীনের অর্থনীতি সমস্যামুক্ত নয়। সম্পত্তি খাতের সংকট, স্থানীয় সরকারের ঋণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা—এগুলো সবই দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে শুল্ক যুদ্ধ (tariff war) নতুন মাত্রা পেলেও, পরবর্তীতে দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক কমানো ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে প্রতিযোগিতা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য একটি প্রশ্ন খুবই প্রাসঙ্গিক। চীন কি সবকিছু নির্ভুলভাবে করেছে? না। বাংলাদেশ কি সবকিছু ভুল করেছে? তাও নয়। কিন্তু চীনের অভিজ্ঞতা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য শুধু একটি খাতের ওপর নির্ভর করলে চলে না। কৃষি উৎপাদনশীলতা, শিল্পায়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এসবগুলোকে একই অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হয়। চীনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই নিহিত।
কোনো দেশ রাতারাতি উন্নত হয় না। তবে ধারাবাহিক নীতি, বাস্তবভিত্তিক সংস্কার এবং কয়েক দশকের পরিকল্পিত বিনিয়োগ একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থানকে আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে। ১৯৭৮ সালে চীন ও বাংলাদেশ যখন প্রায় একই অর্থনৈতিক স্তর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, তখন ভবিষ্যতের এই বিশাল ব্যবধান কেউ হয়তো কল্পনাও করেনি।
আজ তাই প্রশ্নটি শুধু ‘চীন কোথায় পৌঁছেছে’ তা নয়। প্রশ্ন হলো—চীনের চার দশকের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ আগামী চার দশকের জন্য কী শিখবে?
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিকশা ও চুলায় বাড়ছে অর্থনীতির চাপ, কোথায় সমাধান?
২ দিন আগে
আইসিসিবিতে চলছে গাড়ির হাটসহ দুটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়
৬ দিন আগে
আইসিসিবিতে জমজমাট আন্তর্জাতিক মেরিটাইম প্রদর্শনী ও সুপার সেল কার বাজার
১ সপ্তাহ আগে