সংবাদ শুনুন
প্লে বাটনে ক্লিক করে সংবাদটি শুনুন
চুয়াডাঙ্গায় নজরুল
১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ—এক শতাব্দীকাল। আজ থেকে এক শতাব্দী পূর্বে চুয়াডাঙ্গায় আগমন করেছিলেন অসামান্য প্রতিভার অধিকারী এক ব্যতিক্রমী মানুষ, এক কিংবদন্তি। বলছিলাম আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর কথা।
"বাবুদের তাল-পুকুরে,
হাবুদের ডাল-কুকুরে,
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম, একটু দাঁড়া..."
উল্লেখ্য, কবিতাংশটি 'লিচু চোর' কবিতা থেকে নেওয়া। আমাদের শৈশবের বহুল পঠিত ও আলোচিত এই কবিতাটি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম চুয়াডাঙ্গায় অবস্থানকালেই রচনা করেন।
বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা ও নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে কবি নজরুল তাঁর জীবন অতিবাহিত করেছেন। ফলে বিভিন্ন সময়ে, নানা কারণে তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন। কখনো মক্তবের দুরন্ত শিশু, কখনো লেটো গানের দলের শিল্পী, আবার কখনো স্বদেশি আন্দোলনের এক বিপ্লবী মহানায়ক—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁর খুরধার লেখনী। এ সবকিছুর সম্মিলনেই সৃষ্টি হয়েছে আমাদের বিদ্রোহী কবি নজরুল।
স্বদেশি আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে রাজনৈতিক কারণে কিংবা লেটো গানের দলের সদস্য হিসেবে তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গমন করেছেন। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ত্রিশাল, কুমিল্লা, খুলনা, যশোর, বরিশাল ও চুয়াডাঙ্গা উল্লেখযোগ্য। এসব স্থানে তিনি বহু সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন, যার অনেকগুলোই কালজয়ী হয়ে উঠেছে। চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গার নিশ্চিন্তপুরেও তিনি একাধিকবার এসেছেন। এখানেই তিনি রচনা করেছেন তাঁর অমর সাহিত্যকর্ম 'লিচু চোর', 'পদ্মগোখরা', 'মৃত্যুক্ষুধা' প্রভৃতি।
চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চল, ভৈরব নদের কোলঘেঁষা কার্পাসডাঙ্গার পূর্বপাড়া নিশ্চিন্তপুরে তরুণ বয়সেই কবির আগমন ঘটে। তাঁর স্মৃতিধন্য খড়ের আটচালা ঘরটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তৎকালীন দামুড়হুদা উপজেলার ভৈরব নদের তীরবর্তী কার্পাসডাঙ্গা মিশনপাড়ার সরকার পরিবার ছিল জ্ঞান-গরিমায় অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত। এ পরিবারের সন্তান শ্রী মহিম সরকার চাকরিসূত্রে কলকাতায় বসবাস করতেন। আমহার্স্ট স্ট্রিটে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কবি নজরুলের গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। তাঁর বাড়িতে কবির আসা-যাওয়া ছিল আপনজনের মতো। মহিম সরকারের দুই মেয়ে আভা রানী সরকার ও শিউলী রানী সরকার নজরুলগীতি চর্চা করতেন এবং তাঁদের গানের তালিম দিতেন স্বয়ং কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
পরবর্তীকালে আভা রানী সরকারের গাওয়া ছয়টি গানের রেকর্ডের তথ্য প্রখ্যাত লেখক ড. আশরাফ সিদ্দিকী অনুসন্ধানের মাধ্যমে খুঁজে পান বলে জানা যায়। আরও জানা যায়, মহিম সরকারের পারিবারিক আমন্ত্রণে কবি নজরুল একাধিকবার কার্পাসডাঙ্গায় এসেছেন। তবে ১৯২৬ সালে, মাত্র ২৭ বছর বয়সে, তিনি সপরিবারে এখানে বেড়াতে আসেন। এ সময় তিনি প্রায় দুই মাস কার্পাসডাঙ্গায় অবস্থান করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন শাশুড়ি গিরিবালা দেবী, স্ত্রী প্রমীলা দেবী এবং বড় ছেলে বুলবুল। তাঁরা কলকাতা থেকে ট্রেনে দর্শনায় এসে সেখান থেকে গরুর গাড়িতে করে কার্পাসডাঙ্গায় পৌঁছান।
১৯৮৭ সালে কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম নসকর আলী কলকাতায় গিয়ে আভা রানী সরকার ও শিউলী রানী সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা দুজনেই নিশ্চিত করেন যে, কবি নজরুল একাধিকবার কার্পাসডাঙ্গায় এসেছিলেন। এছাড়া জানা যায়, তিনি পার্শ্ববর্তী কুড়ুলগাছির গাঙ্গুলী ও মজুমদার বাড়িতেও কয়েকবার গিয়েছিলেন।
কার্পাসডাঙ্গায় নজরুলকে প্রথম কাগজে-কলমে তুলে ধরেন পার্শ্ববর্তী কোমরপুর গ্রামের কৃতী লেখক এম. ইব্রাহিম। তাঁর রচিত 'নজরুল ও নিশ্চিন্তপুর' গ্রন্থটি ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হয়। এর অধিকাংশ লেখা চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক 'দর্পণ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। এ গ্রন্থে তিনি নজরুলের কার্পাসডাঙ্গা-জীবনের নানা দিক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। উল্লেখ্য, 'নিশ্চিন্তপুর' হলো কার্পাসডাঙ্গার পূর্বপাড়ার নাম।
এই অঞ্চল সম্পর্কে এক ব্রিটিশ পর্যটকের উদ্ধৃতি দিয়ে নদীয়া গেজেটে লেখা হয়েছিল—"নিশ্চিন্তপুরের কাছে ভৈরব নদী যেমন দেখা যায়, তেমন সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীর আর কোথাও নেই।" ফ্রেডরিক অ্যাসকল নামের এক বণিক সর্বপ্রথম নিশ্চিন্তপুরে নীলকুঠি স্থাপন করেন। পরে জেমস এইচ. হিলস সেটি ক্রয় করেন। তাঁর অধীনে ১৩ হাজার ২০০ বিঘা জমিতে বছরে ৯০০ মণ নীল উৎপাদিত হতো এবং বিপুলসংখ্যক কৃষক ও কর্মচারী এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
কবি এখানে অবস্থানকালে যে সাহিত্যকর্মগুলো রচনা করেন, তার মধ্যে অন্যতম 'পদ্মগোখরা'। এটি নিয়ে একটি প্রচলিত ঘটনা রয়েছে। কার্পাসডাঙ্গা মিশনপাড়ার প্রয়াত শ্রী দ্বারিক নাথ ওরফে তেরেন সরকারের ভাষ্যমতে, মিশন চত্বরে কয়েকটি ঝাউগাছ ছিল। একদিন তিনি সেখানে একটি বিষধর সাপ দেখতে পান এবং সেটিকে মেরে ফেলেন। পরে কবি নজরুল বিষয়টি জেনে ক্ষুব্ধ হন। ধারণা করা হয়, এ ঘটনার অনুপ্রেরণায় তিনি 'পদ্মগোখরা' রচনা করেন।
প্রয়াত দ্বারিক নাথ আরও জানান, কবি কলকাতা ও কৃষ্ণনগর থেকে একাধিকবার কার্পাসডাঙ্গায় এসেছেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, কার্পাসডাঙ্গার বিপিন সরকারের সঙ্গে কবি তাসও খেলেছেন। যদিও তাঁর আগমনের পেছনে পারিবারিক আমন্ত্রণ ছিল, তবু স্বদেশি আন্দোলনকে বেগবান করতে তিনি এখানে অনেক নেতাকর্মীর সঙ্গে গোপন বৈঠকও করেছিলেন।
মহিম সরকারের আমন্ত্রণে কার্পাসডাঙ্গায় আসার পর এখানকার কংগ্রেস নেতা ও শিক্ষক হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের সঙ্গে কবির গভীর সখ্য গড়ে ওঠে। হর্ষপ্রিয় বিশ্বাস ছিলেন বর্তমান ভারতের শিমুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি হিসেবে তাঁর সঙ্গে কবির আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাঁর ছিল একটি পরিপাটি মাটির আটচালা ঘর।
কবি নজরুল কার্পাসডাঙ্গায় এলে এই ঘরেই অবস্থান করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। যে খাটে তিনি ঘুমাতেন, যে আলমারিটি ব্যবহার করতেন—সেগুলো আজও অক্ষত রয়েছে। কবির স্মৃতিকে ধারণ করে বংশপরম্পরায় এই ঘর সংরক্ষণ করে আসছেন প্রকৃতি বিশ্বাস।
হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের উদ্যোগেই প্রথমে আটচালা ঘরটি সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর ছেলে বাবু প্রদ্যুত বিশ্বাস সেই দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে কবির স্মৃতিবিজড়িত এই ঘর সংরক্ষণ করছেন হর্ষপ্রিয় বিশ্বাসের দৌহিত্র প্রকৃতি বিশ্বাস। প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিশ্বাস পরিবার নিজ উদ্যোগে ও নিজ ব্যয়ে এই খড়ের ঘরটি রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। কবি নজরুলের কার্পাসডাঙ্গা-স্মৃতিকে জাতীয়ভাবে পরিচিত করে তুলতেও এ পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমানে সরকারও বাড়িটি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় দামুড়হুদা উপজেলা প্রশাসন ঘরটির পাশে নজরুল স্মৃতিফলক নির্মাণ করে। কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে এখানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। আজও মুজিবনগরগামী পর্যটকসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা কবির স্মৃতিবিজড়িত এই ঘরটি দেখতে ভিড় জমান।
লেখক : মোঃ আবু বকর সিদ্দিক
সংবাদটি আপনার কাছে কেমন লেগেছে?
সম্পর্কিত সংবাদ
আলমডাঙ্গা ব্যায়ামাগার কর্তৃক নিউরো সার্জন অধ্যাপক ডা. মোখলেছুর রহমানকে সংবর্ধনা প্রদান
৪৭ মিনিট আগে
আলমডাঙ্গায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মহাব্বত আলীর দাফন সম্পন্ন
২ ঘন্টা আগে
কৃত্রিম সংকট রোধ ও ডিলারদের মজুত- বিক্রির হিসাব যাচাই সরেজমিনে পরিদর্শন; চুয়াডাঙ্গায় মাঠে নামছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব
২ ঘন্টা আগে